স্পেনের ভ্যালেন্সিয়া প্রদেশে শিশুদের এনেসথেসিয়া (চেতনানাশক) প্রয়োগের সময় একাধিক জটিলতা ও একটি মৃত্যুর ঘটনার পর একই অ্যানেসথেসিস্টকে কেন্দ্র করে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ১৯ নভেম্বর পাটেরনার একটি বেসরকারি দন্ত ক্লিনিকে পাঁচ বছরের একটি শিশুকে এনেসথেসিয়া (চেতনানাশক) দেওয়ার পর হঠাৎ গুরুতর শারীরিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। শিশুটি প্রচণ্ড অবসাদ, বমি ভাব এবং শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণ অনুভব করে। পরিবার দ্রুত তাকে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেলে জানা যায়, এনেসথেসিয়ার (চেতনানাশক) সময় ব্যবহৃত ওষুধের ধরণ ও ডোজ ছিল সন্দেহজনক। এই ঘটনার তথ্য তদন্তকারী সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছানোর পরই আলজিরায় ঘটে যাওয়া দুই শিশুর ঘটনার সঙ্গে এর যোগসূত্র স্পষ্ট হতে থাকে এবং তদন্তের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়।
এর ঠিক পরদিন, ২০ নভেম্বর, আলজিরার একটি দন্ত ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসে দুই শিশু। প্রথমজন—৬ বছর বয়সী এক মেয়ে—এনেসথেসিয়া (চেতনানাশক) নেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই হৃদ্যন্ত্র বন্ধ হয়ে পড়ে এবং তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। একইদিন আরেক ৪ বছর বয়সী শিশু অস্বাভাবিক তন্দ্রা, বমি ও উচ্চ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে ভ্যালেন্সিয়ার ক্লিনিকো হাসপাতালের শিশু আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে দুই ঘটনাতেই এনেসথেসিয়া (চেতনানাশক) প্রদান করেছিলেন একই ৪৩ বছর বয়সী অ্যানেসথেসিস্ট, যিনি তিন ধরনের শিরায় প্রয়োগযোগ্য ওষুধ ব্যবহার করেছিলেন, যার মধ্যে ছিল শক্তিশালী সেডেটিভ মিডাজোলাম।
পুলিশ তদন্তে বেরিয়ে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—এনেসথেসিয়ায় (চেতনানাশক) ব্যবহৃত মিডাজোলাম ও প্রপোফলসহ বেশ কয়েকটি ওষুধ হাসপাতাল দে মানিসেস থেকে চুরি করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ওষুধের স্টক ও ব্যাচ নাম্বার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অ্যানেসথেসিস্ট ওই হাসপাতালটিতে চাকরি করার সময়ই ওষুধগুলো নেওয়া হয়। এতে ধারণা জোরদার হয় যে অনুমোদনহীন ও অনুপযুক্ত পরিবেশে, সঠিক সংরক্ষণ ছাড়াই এসব শক্তিশালী অ্যানেসথেটিক ব্যবহার করা হয়—যা শিশুদের ক্ষেত্রে ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। স্বাস্থ্য निरीক্ষকরাও এখন পরীক্ষা করছেন ওষুধগুলো কোনোভাবে দূষিত বা মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল কি না, কিংবা ভুলভাবে সংরক্ষণ বা পরিবহনের কারণে কার্যকারিতা নষ্ট হয়েছিল কি না।
এদিকে অ্যানেসথেসিস্টকে গত সপ্তাহে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হলে পাঁচ ঘণ্টার জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বিচারক তাকে শর্তসাপেক্ষ জামিনে মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত দেন। বিচারকের মতে, যদিও ঘটনাগুলো অত্যন্ত গুরুতর, তবু মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে অ্যানেসথেসিস্টের অবহেলা এই পর্যায়ে পুরোপুরি প্রমাণিত হয়নি। তবু তার বিরুদ্ধে পেশাগত অবহেলায় হত্যাকাণ্ড, গুরুতর শারীরিক ক্ষতি, ওষুধ চুরি এবং রোগীকে যথাযথভাবে সহায়তা না করার মতো মারাত্মক অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। জামিনের শর্ত হিসেবে তার পাসপোর্ট জমা নেওয়া হয়েছে, তাকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিতে হবে।
তদন্ত এখন শুধুমাত্র আলজিরা ও পাটেরনার ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ ইতোমধ্যে কাতাররোহা, সাগুন্তো, ভ্যালেন্সিয়া শহরসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিকে অনুসন্ধান শুরু করেছে—যেসব স্থানে অভিযুক্ত অ্যানেসথেসিস্ট চুক্তিভিত্তিক বা খণ্ডকালীন কাজ করতেন। এসব ক্লিনিকের অনুমোদনপত্র, এনেসথেসিয়ায় (চেতনানাশক) ব্যবহৃত ওষুধের রেকর্ড, চিকিৎসা প্রক্রিয়ার নথি, এমনকি গত কয়েক মাসে এনেসথেসিয়া (চেতনানাশক) নেওয়া রোগীদের অবস্থার ইতিহাসও যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তকারীদের ধারণা, আরও এমন ঘটনা থাকতে পারে যা এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
আলজিরার ক্লিনিক, যেখানে একটি শিশুর মৃত্যু হয়, সেটিও তদন্তে অসংখ্য অনিয়মের প্রমাণ দিচ্ছে। ক্লিনিকটির বয়স্ক মালিককে গ্রেপ্তার করে পরে জামিনে ছাড়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি—ক্লিনিকটির ইনট্রাভেনাস এনেসথেসিয়া (চেতনানাশক) দেওয়ার কোনো অনুমতি ছিল না, অর্থাৎ শক্তিশালী অ্যানেসথেটিক ব্যবহারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি পরিচালনা করার লাইসেন্স তাদের ছিল না। তবুও সেখানে এমন সেবা দেওয়া হচ্ছিল, যা সরাসরি রোগীর জীবনের জন্য বিপজ্জনক।
পাটেরনার নতুন ঘটনাটি যদি চিকিৎসাগত অবহেলা হিসেবে প্রমাণিত হয়, তাহলে অভিযুক্ত অ্যানেসথেসিস্টের বিরুদ্ধে আরও একটি নতুন মামলা যুক্ত হতে পারে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ, পুলিশ এবং ফরেনসিক বিভাগ মিলে এখন টক্সিকোলজি রিপোর্ট, ওষুধের লট নম্বর, ক্লিনিকগুলোর ভিডিও ফুটেজ, কর্মীদের জবানবন্দি এবং শিশুদের চিকিৎসা নথি বিশ্লেষণ করছে। সবকিছু স্পষ্ট হলে এ মামলার পরিধি আরও বড় হতে পারে এবং অভিযুক্ত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাও জোরদার হয়েছে।