১৭৯৭, ১৮৮৫, ১৮৯৭—ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, বাংলা ও উপমহাদেশে কয়েক দশক পরপর বড় ভূমিকম্প ফিরে এসেছে ভয়াবহ রূপ নিয়ে। সেই ধারাবাহিকতার মাঝেই ২০২৫ সালের মাধবদীর ভূকম্পন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বাংলাদেশ কি আবারও সেই পুরনো পথের দিকে হাঁটছে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক কম্পনগুলো এমন এক ভূগর্ভস্থ চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দীর্ঘসময় ধরে জমে আছে এবং যেকোনো সময় আরও বড় ধাক্কা আনার সামর্থ্য রাখে।
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীর মাধবদীতে রিখটার স্কেলে প্রায় ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। উৎপত্তিস্থল ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে, ফলে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কম্পন প্রবলভাবে অনুভূত হয়। এই ভূমিকম্পে অন্তত ১০ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। ঘনবসতি ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে ঢাকায় ক্ষতির ঝুঁকি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল বলে মন্তব্য করেছেন ভূমিকম্পবিদরা।
তবে এই কম্পন হঠাৎ আসেনি; বরং অতীতের বড় ভূমিকম্পগুলোর ইতিহাস এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি ভূতাত্ত্বিক চাপে আলোকপাত করে। ১৭৬২ সালের আর্কান ভূমিকম্প, ১৮৮৫ সালের ম্যানিকগঞ্জ ভূমিকম্প এবং ১৮৯৭ সালের গ্রেট আসাম ভূমিকম্প—সবগুলোই ছিল এ অঞ্চলের সক্রিয় ফল্ট লাইনের চাপমুক্তির বড় উদাহরণ। বিশেষ করে শিলং প্লেটোর দক্ষিণে অবস্থিত ডাউকি ফল্ট একাধিকবার বড় ধাক্কার উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গবেষকরা মনে করছেন, এই ফল্ট লাইনে পুনরাবৃত্তির সময় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ বছর হতে পারে। অর্থাৎ শেষ বড় ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত যে সময় পেরিয়ে গেছে, তা নতুন একটি বড় চাপমুক্তির সম্ভাবনা তৈরি করছে।
এ অঞ্চলের টেকটনিক গঠনও উদ্বেগ বাড়ায়। ভারতীয়, বার্মিজ এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষে ভূগর্ভে সার্বক্ষণিক চাপ তৈরি হয়। ডাউকি, মাধুপুরসহ একাধিক সক্রিয় ফল্ট লাইন সেই চাপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিছু বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন, সাম্প্রতিক মাধবদী কম্পনগুলো ওই অভ্যন্তরীণ চাপের আংশিক মুক্তি মাত্র—পুরো শক্তি এখনও সঞ্চিত রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, কয়েকটি ফল্টে “সিজমোজেনিক গ্যাপ” তৈরি হয়েছে, যা দীর্ঘ নীরবতার পর বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাড়ায়।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা। বিশ্বজুড়ে ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান বহুদিন ধরেই সমালোচনার কেন্দ্র। জনসংখ্যার ঘনত্ব, পুরনো ভবনের আধিক্য, অপ্রতুল রেট্রোফিটিং এবং পরিকল্পনাহীন নির্মাণ—সবকিছু মিলিয়ে একটি মাঝারি বা বড় ভূমিকম্প ঢাকাকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, “ঢাকা প্রস্তুত নয়”—এটাই হলো বর্তমান বাস্তবতা।
এই পরিস্থিতিতে জরুরি হয়ে উঠেছে দুই ধরনের প্রস্তুতি—সরকারি ও ব্যক্তিগত। ফল্ট লাইন গবেষণা, ভবনের ভূমিকম্প প্রতিরোধী মান নিশ্চিত করা, পুরনো ভবনের রেট্রোফিটিং, জরুরি উদ্ধার প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা—সবকিছুই এখন অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্প প্রতিরোধ নয়; বরং এর ঝুঁকি কমিয়ে ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হওয়াই একমাত্র পথ।
১৭৯৭ থেকে ২০২৫—দুই শতাব্দীরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা বলছে, বড় ভূমিকম্প এ অঞ্চলে বারবার ফিরে এসেছে। আর মাধবদীর সাম্প্রতিক কম্পন সেই ইতিহাসের দিকে নতুন করে আলো ফেলেছে। ভূগর্ভের চাপ কখন কোথায় কতটা শক্তি নিয়ে বেরোবে—এটা কেউ বলতে পারে না। কিন্তু ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক বাস্তবতা এক সুরেই বলছে: বাংলাদেশ এখন সতর্কতার এক নতুন দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।