গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় শুরু হয়েছে চোরাগোপ্তা হামলার ধারাবাহিকতা। গত কয়েকদিন ধরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে এসব ছোট ছোট ঘটনার কারণে বড় ধরনের নাশকতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দাবি করছে, তারা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। তবুও দুর্বৃত্তরা চোখ ফাঁকি দিয়ে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে। হামলাকারীরা কারা, তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে, কারণ কখন কোথায় হামলা ঘটবে, তার কোনো পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে না।
সোমবার ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অন্তত ১২টি ককটেল বিস্ফোরণ ও তিনটি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ধানমণ্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনে শান্ত মারিয়ম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বাসে দুর্বৃত্তরা আগুন দেয়। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। একই সময়ে আগারগাঁও রেডিও স্টেশনের সামনে, মিরপুর শাহ আলী মার্কেট এবং সবুজবাগ এলাকায়ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ডিএমপি জানায়, এসব ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ২৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে কাকরাইলের সেন্ট মেরিজ ক্যাথেড্রাল ও সেন্ট যোসেফ স্কুলে বিস্ফোরণের ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
রায়ের দিন ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জাতীয় ঈদগাহ মাঠে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট এলাকা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় ও বার ভবনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেও অতিরিক্ত নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। থানায় কড়া নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে, এবং পুলিশ টহল, চেকপোস্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছে।
গত কয়েক দিনে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ধানমণ্ডি, মেরুল বাড্ডা, শাহজাদপুর, কাকরাইল, মিরপুর, সবুজবাগ ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় এসব হামলা চালানো হয়েছে। দুর্বৃত্তরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে দ্রুত বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলো পরিকল্পিত ও সমন্বিত। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এভাবে ছোট ছোট হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তরা নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা যাচাই করে নেয়, এরপর বড় ধরনের হামলায় নামে। গির্জা, স্কুল, বাস ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোকে তারা আসন্ন নাশকতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, শেখ হাসিনার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি পুলিশের তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর প্রতিটি থানায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের তালিকা ধরে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবুও পুলিশের উপস্থিতি কম এমন জায়গাগুলো বেছে নিয়ে দুর্বৃত্তরা হামলা চালাচ্ছে। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেছেন, “ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড, আর গান পাউডার দিয়ে বাসে আগুন দিতে লাগে এক মিনিটও না—তাই শত সতর্কতা সত্ত্বেও সব জায়গায় একসাথে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।”