চট্টগ্রামে বিএনপির জনসংযোগে ভয়াবহ গুলির ঘটনা ঘটেছে—কর্মীদের ভিড়ে মিশে এক যুবক খুব কাছ থেকে ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করেন সরোয়ার হোসেনকে। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন বিএনপির চট্টগ্রাম-৮ আসনের প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহসহ আরও চারজন।
বুধবার সন্ধ্যায় নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার চালিতাতলী খন্দকারপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মাগরিবের নামাজের পর এরশাদ উল্লাহ স্থানীয় দোকানপাট ঘুরে ধানের শীষের পক্ষে গণসংযোগ করছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কয়েকশ নেতা–কর্মী। হঠাৎ পেছন থেকে মাস্ক পরা কয়েকজন যুবক ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে, মুহূর্তের মধ্যে গুলি চালায়। এর মধ্যে একজন খুব কাছ থেকে সরোয়ার হোসেনের ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে একের পর এক সাত থেকে আটটি গুলি করে।
গুলির শব্দে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান নেতা–কর্মীরা। মুহূর্তেই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সরোয়ার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, পাশে পড়ে ছিলেন আরও কয়েকজন গুলিবিদ্ধ। পরে তাঁদের উদ্ধার করে চট্টগ্রাম নগরের এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর পেটে ছররা গুলি লেগেছে। তিনি এখন শঙ্কামুক্ত। আহত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের তিন নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক ইরফানুল হক শান্ত, বিএনপি কর্মী আমিনুল হক ও মুর্তজা হক। ইরফানুলের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
পুলিশ জানায়, নিহত সরোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও হত্যাসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। তিনি স্থানীয়ভাবে ‘বাবলা’ নামে পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর সঙ্গে তাঁর আধিপত্যের দ্বন্দ্ব চলছিল। এর আগে গত ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকায় সরোয়ারকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। সে সময় দুজন নিহত হলেও সরোয়ার প্রাণে বেঁচে যান।
সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের জানিয়েছেন, ঘটনার মাত্র তিন দিন আগে তাঁর ছেলেকে ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তাঁকে বলা হয়—“তোর সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নে।” হুমকিদাতা ছিলেন স্থানীয় সন্ত্রাসী মো. রায়হান, যিনি সাজ্জাদ আলীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
আবদুল কাদের বলেন, “বুধবার সন্ধ্যায় বাড়ির কাছেই বিএনপির জনসংযোগে অংশ নিতে গিয়েছিল আমার ছেলে। মাগরিবের নামাজের পর এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে দোকানের পাশে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎ পেছন থেকে মাস্ক পরা কয়েকজন এসে সরোয়ারের ঘাড়ে গুলি করে। আমি তখন পাশে ছিলাম। বুঝতেই পারিনি ছেলেকে গুলি করা হয়েছে। পরে দেখি, সে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কোলে নিয়েই হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু রিকশাতেই মারা যায়।”
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছি—টার্গেট ছিল সরোয়ার, বিএনপি প্রার্থী নয়। গুলিবর্ষণকারীরা মোটরসাইকেলে করে এসে দ্রুত পালিয়ে যায়। কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের শনাক্তে আমরা গুরুত্বপূর্ণ আলামত পেয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, “নির্বাচনের আগে এমন সন্ত্রাসী হামলা উদ্বেগজনক। আমরা রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুরোধ করছি—যে কোনো জনসভা বা গণসংযোগের ২৪ ঘণ্টা আগে পুলিশকে জানাতে। এতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।”
ঘটনার পর পুরো চালিতাতলী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১১টার দিকে দেখা যায়, দোকানপাট বন্ধ, রাস্তায় লোকজন নেই। সাধারণত এলাকাটি গভীর রাত পর্যন্ত সরব থাকে, কিন্তু গুলির ঘটনার পর নেমে আসে নীরবতা। স্থানীয়রা ভয়ে মুখ খুলতেও রাজি নন।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত সরোয়ারের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের ধরতে অভিযান শুরু হয়েছে। বায়েজিদ, পাঁচলাইশ ও চান্দগাঁও এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সরোয়ারের পরিবার বলছে, এক মাস আগেই তাঁর বিয়ে হয়। বিয়েতে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহসহ অনেক স্থানীয় নেতা উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের আগস্টে কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে তিনি বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করেন।
এ ঘটনায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই। প্রার্থী গণসংযোগ করছিলেন, সেখানে শত শত লোক ছিল। সরোয়ার ব্যক্তিগতভাবে সেখানে যোগ দেন। পুরনো বিরোধের জের ধরে তাঁকে লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে।”