আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ২০২৫ সংশোধন করে গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে। এতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত পরিবর্তন হলো— জোট করলেও প্রতিটি দলকে নিজস্ব প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে। অর্থাৎ, একাধিক নিবন্ধিত দল জোট গঠন করলেও অন্য দলের প্রতীকে ভোট করা যাবে না।
নতুন সংশোধনে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্বাচন স্থগিত করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। চালু করা হয়েছে ‘না ভোট’। বাতিল করা হয়েছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) সংক্রান্ত সব ধারা। এছাড়া প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালটে ভোটের সুযোগ, আদালতে ‘পলাতক’ ঘোষিত ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিল, এবং মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয় সোমবার এই অধ্যাদেশের গেজেট প্রকাশ করেছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনী আইন সংস্কারের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। এর আগে ইসি ভোটার তালিকা আইন, নির্বাচন কর্মকর্তা বিশেষ বিধান আইন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন, ভোটকেন্দ্র নীতিমালা, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণ নীতিমালা ও সাংবাদিক নীতিমালা সংশোধন করেছে।
আরপিওর ২০ অনুচ্ছেদে সংশোধন করে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো নিবন্ধিত দল জোট গঠন করলেও প্রতিটি দলকে নিজ নিজ প্রতীকে ভোট করতে হবে। বিএনপি এ ধারার বিরোধিতা করলেও জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সংশোধনের পক্ষে মত দিয়েছে।
যদি কোনো আসনে একজন প্রার্থী থাকেন, তাহলে সেই আসনে ‘না ভোট’ অপশন থাকবে। প্রার্থী যদি ‘না ভোট’-এর চেয়ে বেশি ভোট পান, তাহলে তিনি নির্বাচিত হবেন। কিন্তু যদি ‘না ভোট’-এর সংখ্যা বেশি হয়, তাহলে নতুন করে ভোটগ্রহণ হবে।
ইভিএম সম্পর্কিত আরপিওর ২৬, ২৬এ, ২৬বি, ২৬সি ও ২৬ডি অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে ভোটগ্রহণ কেবল ব্যালট পেপারে হবে।
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন। এজন্য তাদের কমিশনের নির্ধারিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত হতে হবে। প্রতিটি ব্যালটে থাকবে অনন্য শনাক্তকরণ নম্বর, যা ভোটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
আদালত কর্তৃক ‘পলাতক’ ঘোষণা পাওয়া কেউ সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্য হবেন না। এ বিষয়ে নতুন উপধারা যোগ করা হয়েছে।
নির্বাচনী সময়ে প্রার্থীর সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য, ছবি, ভিডিও বা এআই–তৈরি কনটেন্ট প্রচার করলে তা দুর্নীতিমূলক কাজ হিসেবে গণ্য হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থা শাস্তির মুখোমুখি হবে।
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে সর্বশেষ আয়কর রিটার্ন এবং দেশ-বিদেশে থাকা সম্পদের বিস্তারিত তথ্য জমা দিতে হবে। এসব তথ্য ইসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় জামানতের পরিমাণ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর কোনো সংসদ সদস্যের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে ইসি নিজ উদ্যোগে শুনানি নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারবে, এবং সেটিই হবে চূড়ান্ত।
ভোটকেন্দ্রে প্রার্থী, এজেন্ট বা রাজনৈতিক কর্মী অপ্রয়োজনে ভিড় করতে পারবেন না। নিয়ম ভঙ্গ করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সরিয়ে দিতে বা গ্রেফতার করতে পারবে।
জোরজবরদস্তি, অনিয়ম বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা সম্ভব না হলে ইসি যেকোনো কেন্দ্র বা পুরো আসনে ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে পারবে।
দলীয় অনুদান ও আর্থিক লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য দলগুলোর নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।
দুই প্রার্থী সমান ভোট পেলে শুধুমাত্র তাদের মধ্যেই পুনরায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে।