নির্বাচনী প্রতীকের তালিকায় পরিবর্তন এনে ১১৯টি প্রতীক চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন যুক্ত হওয়া চারটি প্রতীকের মধ্যে রয়েছে ‘শাপলা কলি’। তবে এ নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। কারণ, নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্পষ্ট জানিয়েছে—তাদের ‘শাপলা কলি’ নয়, কেবল ‘শাপলা’ প্রতীকই চাই।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর) নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা-২০০৮ সংশোধন করে নতুন এই প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে পূর্বের ১১৫টি প্রতীকের তালিকা থেকে ১৬টি প্রতীক বাদ দেওয়া হয় এবং নতুন করে চারটি প্রতীক যুক্ত হয়—‘শাপলা কলি’, ‘সিঁড়ি’, ‘হ্যান্ডশেক’ ও ‘সূর্যমুখী’। ফলে মোট প্রতীকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৯টি।
ইসির এক কর্মকর্তা জানান, “শাপলা কলি প্রতীকটি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত কমিশনের নিজস্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এটি কোনো দলের দাবি বা চাপের প্রতিক্রিয়া নয়।”
এনসিপির দাবি: “শাপলা কলি নয়, শাপলাই লাগবে”:
প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই মানবজমিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক জাভেদ রাসিন বলেন, “আমাদের চাহিদা মোতাবেক শাপলা দিতে হবে। শাপলা কলি প্রতীক আমরা নেবো না। যদি শাপলা কলি দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে শাপলা কেন দেওয়া যাবে না?”
দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এক সেমিনারে বলেন, “শাপলার প্রশ্নে আমরা আপসহীন। শাপলা নিয়ে আমরা একবিন্দু ছাড় দেবো না। নির্বাচন কমিশন আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তারা চাইলে দ্রুত তালিকায় শাপলাকে যুক্ত করতে পারে।”
তিনি ইসির উদ্দেশে আরও বলেন, “আপনারা বিএনপি-জামায়াতকে সুবিধা দিচ্ছেন, আওয়ামী লীগকে এগিয়ে রাখতে মাঠ তৈরি করছেন। এই খেলা বন্ধ করুন, না হলে আমরা ইসির সামনে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নামব।”
এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্থা শারমিনও একই সুরে বলেন, “গেজেটভুক্ত ‘শাপলা কলি’ দিয়ে ইসি আমাদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে চাইছে। কোনো আইনি বা সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ছাড়াই এটি করা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন চাইলে এই কমিশন পুনর্গঠন জরুরি।”
ইসির ব্যাখ্যা: “শাপলা আর শাপলা কলি এক নয়”:
বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আন্তমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন,“‘শাপলা’ আর ‘শাপলা কলি’র মধ্যে পার্থক্য আছে, এটি ব্যাখ্যার অবকাশ রাখে না। কারও দাবিতে নয়, কমিশন নিজস্ব বিবেচনায় ‘শাপলা কলি’ যোগ করেছে।”
তিনি আরও বলেন, “কমিশন মনে করেছে যে এই প্রতীক রাখা যেতে পারে। কেউ চেয়েছে বা চায়নি—সেটি বিষয় নয়। ভবিষ্যতে প্রয়োজন মনে করলে আবার সংশোধন করা হবে। এটি কোনো স্থির আইন নয়।”
আখতার আহমেদ এও জানান, “কিছু প্রতীক নিয়ে সমালোচনা এসেছিল, সেগুলো বিবেচনায় নিয়ে তালিকা থেকে কিছু বাদ ও নতুন কিছু যুক্ত করা হয়েছে। এতে কমিশনের স্বাধীনতা প্রমাণিত হয়েছে।”
এনসিপির অবস্থান আরও কঠোর:
ইসি সচিবের ব্যাখ্যা সত্ত্বেও এনসিপি তাদের অবস্থানে অনড়। দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন ফেসবুকে লেখেন,
“শাপলার কোনো বিকল্প নেই। বিকল্প কেবল শাপলার ভেতর থেকেই হতে পারে। আমরা শাপলার নানা ডিজাইন দিয়েছিলাম, কিন্তু কমিশন তা না নিয়ে শাপলা কলিকে বেছে নিয়েছে। শাপলা কলি কেমন দৃষ্টিনন্দন হয়েছে, সেটি আমরা বুঝতে চাই।”
এনসিপি সূত্রে জানা যায়, দলটি শাপলা প্রতীক না পেলে নির্বাচনে অংশ না নেওয়া কিংবা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
পটভূমি:
গত ২২ জুন দল হিসেবে নিবন্ধনের আবেদন করে এনসিপি। শুরু থেকেই তাদের দাবি ছিল “শাপলা” প্রতীক। কিন্তু নির্বাচন কমিশন জানায়, শাপলা যেহেতু জাতীয় প্রতীক, তাই এটি কোনো দলের প্রতীক হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর থেকে প্রায় চার মাস নয় দিন ধরে ইসির সঙ্গে এনসিপির টানাপোড়েন চলে আসছে।
২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রথম গেজেটে প্রতীকের সংখ্যা ছিল ১১৫টি—সেখানে শাপলা ছিল না। এবার নতুন প্রজ্ঞাপনে প্রতীক বেড়ে দাঁড়াল ১১৯টি, তবে তাতেও পূর্ণাঙ্গ শাপলা নয়—শুধু শাপলা কলি।
বিশ্লেষণ:
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক শুধু একটি প্রতীককে ঘিরে নয়; বরং জাতীয় প্রতীক ব্যবহারের আইনগত ও নৈতিক সীমা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। শাপলা বাংলাদেশের জাতীয় ফুল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতীকের অংশ, তাই এটিকে দলীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার নিয়ে ইসির সতর্কতা যুক্তিসঙ্গত। তবে ইসির এই সিদ্ধান্তের পেছনে স্বচ্ছতা ও যোগাযোগের অভাব থাকায় বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে।
এনসিপির ‘শাপলা না পেলে নির্বাচন নয়’ অবস্থান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, ইসি যদি জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ় থাকতে চায়, তবে তাদের যুক্তি ও সিদ্ধান্ত আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা জরুরি।
‘শাপলা প্রতীক’ ইস্যু এখন নির্বাচন কমিশনের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উভয় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
একদিকে নতুন দল এনসিপির দাবি—তাদের অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন; অন্যদিকে কমিশনের দায়িত্ব—জাতীয় প্রতীকের মর্যাদা রক্ষা করা।
ইসির যুক্তি অনুযায়ী “শাপলা” ও “শাপলা কলি” পৃথক প্রতীক হলেও, জনমনে এই সূক্ষ্ম পার্থক্য কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—তা সময়ই বলে দেবে।