বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে প্রভাব বাড়াচ্ছে একটি সীমিত অর্থনৈতিক অভিজাত শ্রেণি। তারা রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রবেশ করে নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে আর্থিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করছে—যা অর্থনৈতিক ভারসাম্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই)–এর কার্যালয়ে ‘মাসিক ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটস (এমএমআই)’ প্রতিবেদনের আগস্ট–সেপ্টেম্বর সংস্করণ প্রকাশ অনুষ্ঠানে এই উদ্বেগের কথা উঠে আসে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ড. মনজুর হোসেন। সভাপতিত্ব করেন পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিআরআই-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান।
আলোচনায় অংশ নেন গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খোন্দকার, পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও সিইও ড. এম. মাসরুর রিয়াজ এবং মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মিসেস তানজিমা মোস্তফা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কিছু ইঙ্গিত দেখা গেলেও মুদ্রাস্ফীতি, বৈষম্য ও কর-জিডিপি অনুপাতের দুর্বলতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। মুদ্রাস্ফীতি ৮ শতাংশের উপরে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে, আর মজুরি বৃদ্ধির হার পণ্যমূল্যের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।
মূল প্রবন্ধে ড. আশিকুর রহমান বলেন, “অর্থনৈতিক অভিজাতরা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, কিন্তু তারা রাজনীতি ও প্রশাসনের ভেতরে প্রবেশে অত্যন্ত দক্ষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা নীতি ও সিদ্ধান্তের বলয় দখল করছে। তাদের প্রভাব যত বাড়বে, অর্থনীতি ও সমাজ তত বিকৃত হবে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি এই শ্রেণিকে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তারা শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে, যেখান থেকে তারা সুবিধা নেয়। ইতিহাস বলছে, এমন ঘটনা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেই ঘটেছে। ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা।”
পিআরআই প্রতিবেদনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমাতে হবে।
ড. মনজুর হোসেন বলেন, “বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে কঠোর মুদ্রানীতি কিছুটা শিথিল করা যেতে পারে, তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
ড. জাইদী সাত্তার বলেন, “আমাদের বাণিজ্যনীতি এখন তুলনামূলক সুবিধার বদলে শুল্ক সুবিধা নির্ভর হয়ে পড়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”
আলোচনায় ড. বজলুল হক খোন্দকার বলেন, “দারিদ্র্য হ্রাসে শুধু প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬.৬ শতাংশ হওয়ায় সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বাড়ানো যাচ্ছে না। বরাদ্দকৃত অর্থের খুব অল্প অংশই সরাসরি দরিদ্র মানুষের হাতে পৌঁছায়।”
ড. এম. মাসরুর রিয়াজ সতর্ক করে বলেন, “নতুন বিনিয়োগ ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ানো সম্ভব নয়,” আর তানজিমা মোস্তফা উল্লেখ করেন, “দেশীয় ব্যাংকগুলোর অনেক এলসি বিদেশে প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, এতে আমদানি খরচ বেড়ে গিয়ে ভোক্তার ওপর চাপ বাড়ছে।”
অর্থনীতিবিদরা একমত হন—ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনৈতিক অভিজাতদের প্রভাব নিয়ন্ত্রণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তা না হলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত হতে পারে।