চিত্রনায়ক সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা অপমৃত্যু মামলাটি এবার হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। সোমবার ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে এ আদেশ দেন। আদালত সালমান শাহের বাবা কমর উদ্দিন আহমদের অভিযোগপত্র এবং ঘটনায় জড়িত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সংযুক্ত করে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আবিদ হাসান বলেন, সালমান শাহের মৃত্যুর পর তার বাবা রমনা মডেল থানায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন। পরের বছর তিনি মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে রূপান্তরের আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। এদিকে আসামি রিজভী ওরফে ফরহাদ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন, যেখানে সালমান শাহকে কীভাবে হত্যা করা হয়, তার বিস্তারিত বিবরণ ছিল। এরপরও মামলাটি দীর্ঘদিন স্থবির অবস্থায় ছিল। সর্বশেষ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) মামলাটি তদন্ত করে আত্মহত্যা হিসেবে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়, যা আদালত গ্রহণ করে আসামিদের অব্যাহতি দিয়েছিলেন। আজ আদালত সেই আদেশ বাতিল করে মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুনভাবে গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং রমনা মডেল থানাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান দেশের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি সালমান শাহ নামে পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুর পরদিন তার বাবা কমর উদ্দিন আহমদ চৌধুরী রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরের বছর, ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি মামলাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে রূপান্তরের আবেদন করেন, যা তদন্তের জন্য সিআইডিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই বছরের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, যেখানে সালমান শাহের মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করলেও তার বাবা প্রতিবেদনটি প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন আবেদন করেন।
২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান। প্রায় ১১ বছর পর, ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট সেই তদন্তের প্রতিবেদন আদালতে দাখিল হয়, যেখানে আবারও সালমান শাহের মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে নারাজি আবেদন দাখিল করেন। ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি আবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন, যেখানে উল্লেখ করা হয়—আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন তার ছেলের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন।
পরে মামলাটি র্যাবের কাছে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও রাষ্ট্রপক্ষ সেই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন করে এবং আদালত র্যাবকে তদন্ত না করার নির্দেশ দেন। এরপর তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় পিবিআইকে। ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআইয়ের পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম প্রায় ছয়শ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন, যেখানে বলা হয়—সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন, এটি কোনো হত্যাকাণ্ড নয়। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালত পিবিআইয়ের প্রতিবেদন গ্রহণ করে মামলাটি খারিজ করেন। এর বিরুদ্ধে সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরীর আইনজীবী রিভিশন আবেদন করেন, যা ২০২২ সালের ১২ জুন আদালত গ্রহণ করেন।
দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে নানা তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলা এই মামলায় সোমবার আদালতের আদেশে নতুন মোড় এসেছে। আদালতের নির্দেশে সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনাটি এখন থেকে হত্যা মামলা হিসেবে পুনরায় তদন্ত করা হবে।