গাজা উপত্যকায় টানা ৭৩৮ দিন বন্দিদশায় থাকার পর অবশেষে শেষ ২০ জন জীবিত ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস। সোমবার দাতব্য সংস্থা রেড ক্রসের কাছে তাদের হস্তান্তর করা হয়। খবর জানিয়েছে এএফপি।
সাত ও ১৩ জনের দুই দফায় এই মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় দফার ১৩ জন জিম্মিকে দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস থেকে রেড ক্রসের বাসে করে তেল আবিবের উদ্দেশে পাঠানো হয়। এই মুক্তি ঘটছে গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় করা ২০ দফা চুক্তির অংশ হিসেবে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বাকি ৪৭ জন নিহত জিম্মির মরদেহও ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করবে হামাস। পাশাপাশি, ২০১৪ সালে গাজায় নিহত এক ইসরায়েলি সেনার মরদেহও ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে।
জিম্মিদের মুক্তির খবরে তেল আবিবের ‘হোস্টেজেস স্কয়ারে’ হাজারো মানুষ ভিড় করেন। এটি গত দুই বছর ধরে জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল। সোমবার সেখানে মানুষ শ্যাম্পেন খুলে উদ্যাপন করেন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। অনেকে ইসরায়েলি ও মার্কিন পতাকা নাড়ান, আবার কেউ সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে পোস্টার তুলে ধরেন। অনেকেই নীরবে দাঁড়িয়ে চোখের জলে মুক্তিপ্রাপ্তদের প্রত্যাবর্তন দেখেন।
দেশজুড়ে বিভিন্ন ঘরে ঘরে জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা টেলিভিশনের সামনে বসে কান্না ও আনন্দে ভেসে যান, যখন প্রিয়জনদের পর্দায় দেখা যায়। দক্ষিণ ইসরায়েলের রেইইম সেনা ঘাঁটির বাইরে মুক্তিপ্রাপ্তদের স্বাগত জানাতে শত শত মানুষ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। রেড ক্রসের তত্ত্বাবধানে গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের পর তাদের প্রথমে ওই ঘাঁটিতে, পরে চিকিৎসার জন্য মধ্য ইসরায়েলের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়।

চুক্তির অংশ হিসেবে ইসরায়েলের বিভিন্ন কারাগারে থাকা হাজারো ফিলিস্তিনি এখনো মুক্তির অপেক্ষায় আছেন। এদের মধ্যে প্রায় ২৫০ জন ইসরায়েলের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের দায়ে আটক, যাদের অনেকের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি নাগরিক হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, সব জীবিত জিম্মি ও নিহতদের মরদেহ ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত কোনো ফিলিস্তিনি বন্দি মুক্তি পাবে না।
অন্যদিকে হামাসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, বন্দি বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় সাতজন শীর্ষ ফিলিস্তিনি নেতাকেও মুক্তি দিতে হবে। এ বিষয়ে আলোচনা এখনো চলছে।
গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে শান্তি ও পুনর্গঠনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতে মিশরের শার্ম এল-শেখে শুরু হচ্ছে ‘গাজা শান্তি সম্মেলন’। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। যদিও এই সম্মেলনে ইসরায়েল ও হামাস সরাসরি অংশ নিচ্ছে না, ফলে পুরো উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এর আগে ট্রাম্প সংক্ষিপ্ত সফরে ইসরায়েলে এসে পার্লামেন্ট নেসেটে বক্তব্য রাখেন এবং শান্তি প্রক্রিয়ায় মার্কিন ভূমিকা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন।
দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও অনিশ্চয়তার পর ইসরায়েলে ফিরে আসা শেষ জীবিত জিম্মিদের মুক্তি দেশটির জনগণের জন্য এক ঐতিহাসিক স্বস্তির মুহূর্ত, যদিও গাজা উপত্যকার ভবিষ্যৎ শান্তি ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে এখনও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।