দিল্লিতে তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মৌলবি আমির খান মুত্তাকির সফর ঘিরে আবারও বিতর্কে জড়িয়েছে ভারত। বিশ্ব রাজনীতিতে ‘নিষিদ্ধ’ তালেবান সরকারের প্রতিনিধিকে আমন্ত্রণ জানানোর পর এবার নতুন করে সমালোচনা ছড়িয়েছে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে। তবে ঘটনাটি দিল্লিতে ঘটলেও, ভারত সরকার এ ঘটনার দায় স্বীকার করেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই নীরবতা ভারত সরকারের অক্ষমতা ও পররাষ্ট্রনীতির দুর্বলতাকেই তুলে ধরেছে। একসময় গণতন্ত্র, ধর্মীয় সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত ভারতের বর্তমান শাসকদল বিজেপির নীতি এখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তালেবানের সঙ্গে নয়াদিল্লির আলোচনা:
গত ১০ অক্টোবর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও তালেবান পররাষ্ট্রমন্ত্রী মৌলবি আমির খান মুত্তাকি পারস্পরিক স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নসহ নানা বিষয়ে আলোচনা করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, উভয় পক্ষ শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদ দমনে ও উন্নয়ন প্রকল্পে ভারত সরকারের ভূমিকার প্রশংসা করেছে তালেবান প্রতিনিধি দল।
ভারত আফগানিস্তানে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—কাবুলে ৩০ শয্যার হাসপাতাল, থ্যালাসেমিয়া কেন্দ্র, আধুনিক ডায়াগনস্টিক ল্যাব এবং ২০টি অ্যাম্বুল্যান্স উপহার দেওয়া। এছাড়া, আফগান শিক্ষার্থীদের জন্য ই-আইসিসিআর বৃত্তি চালু রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে ভারত।
বিতর্কের সূত্রপাত:
সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের নিষিদ্ধ করা হলে তা নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বিরোধীদল কংগ্রেস এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির অবস্থান স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে।
কংগ্রেস নেতা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছেন, “গণতন্ত্রের মুখোশ পরে নারী সাংবাদিকদের বাদ দেওয়া শুধু লজ্জাজনক নয়, বিপজ্জনকও।”
আরেক নেতা পি. চিদম্বরমের মতে, “এমন বৈষম্যমূলক আয়োজনে উপস্থিত থাকা পুরুষ সাংবাদিকদেরও প্রতিবাদ জানিয়ে বের হয়ে আসা উচিত ছিল।”
‘শত্রুর শত্রু’ কূটনীতি:
আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বৈরী ছিল। কিন্তু বর্তমানে পাকিস্তান ও তালেবানের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় নয়াদিল্লি যেন সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখতে ভারত তালেবানকে কাছে টানছে।
তবে অনেক পর্যবেক্ষক সতর্ক করে বলেছেন, “শত্রুর শত্রু সবসময় মিত্র হয় না।” ধর্মীয় চরমপন্থার জন্য সমালোচিত তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা ভারতের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং তা শেষ পর্যন্ত দিল্লির জন্য ‘হিতে বিপরীত’ হতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ‘চৌকসতা’ নাকি বিভ্রান্তি:
বিজেপি সরকার নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি ‘চৌকস কূটনীতি’ বলে দাবি করলেও বাস্তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সম্পর্ক এখন অনেক দেশের সঙ্গে টানাপোড়েনে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ায় নয়াদিল্লি এখন এমন একটি সরকারকে সহযোগিতা করছে, যাকে বিশ্বে কোনো দেশই স্বীকৃতি দেয়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারী অধিকার লঙ্ঘনকারী ও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন তালেবান সরকারের সঙ্গে প্রকাশ্য কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে আরও দুর্বল করবে।