স্পেনে বসবাস ও কাজের অনুমতি পাওয়ার আশায় থাকা অভিবাসীদের কাছ থেকে ৩০ হাজার ইউরো পর্যন্ত আদায় করে ভুয়া চাকরির চুক্তি তৈরির অভিযোগে বড় একটি অপরাধী চক্রের সন্ধান পেয়েছে কাতালোনিয়ার পুলিশ। এ ঘটনায় বার্সেলোনা প্রদেশে ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে মোসোস দেস্কোয়াদ্রা। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৩ জন ব্যবসায়ী। পুলিশের হিসাবে, চক্রটি অন্তত ৩২ লাখ ইউরো আয় করেছে। তাদের লক্ষ্যবস্তুতে প্রধানত পাকিস্তানের নাগরিকেরা থাকলেও স্পেনে আগে থেকেই বসবাসরত অভিবাসীরাও এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পাকিস্তান থেকে স্পেনে আসতে ৩০ হাজার ইউরো
মোসোস দেস্কোয়াদ্রার তদন্ত অনুযায়ী, চক্রটি পাকিস্তানে থাকা এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করত, যারা স্পেনে এসে কাজ করতে এবং বসবাসের অনুমতি পেতে আগ্রহী ছিলেন। তাদের স্পেনের কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হতো। বিনিময়ে ভিসা ও বসবাসের অনুমতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ইউরো পর্যন্ত নেওয়া হতো।
এই প্রক্রিয়ায় স্পেনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে চাকরির প্রস্তাব ও চুক্তিপত্র তৈরি করা হতো। কাগজে-কলমে এসব চাকরির প্রস্তাব বাস্তব মনে হলেও তদন্তকারীদের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত চাকরির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বৈধ চাকরির প্রস্তাব দেখিয়ে অভিবাসীদের জন্য অনুমতির আবেদন করা।

শুধু পাকিস্তানে থাকা ব্যক্তিরাই নয়, স্পেনে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন এমন অভিবাসীদেরও লক্ষ্য করেছিল চক্রটি। যাঁরা নিজেদের অভিবাসন পরিস্থিতি নিয়মিত করতে চাইছিলেন, তাঁদের ভুয়া চাকরির চুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে জনপ্রতি সর্বোচ্চ ৮ হাজার ইউরো পর্যন্ত নেওয়া হতো।
৪৩ ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া চাকরির চুক্তি
এই চক্রের কার্যক্রমে ব্যবসায়ীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তকারীদের দাবি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা নিজেদের কোম্পানির নাম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ব্যবহার করতে দিতেন, যাতে বিদেশি কর্মীদের জন্য চাকরির প্রস্তাব তৈরি করে প্রশাসনিক অনুমতির আবেদন করা যায়।
গ্রেপ্তার হওয়া ৫০ জনের মধ্যে সাতজনকে অপরাধী চক্রের কথিত সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ৪৩ জন ব্যবসায়ী, যাঁদের বিরুদ্ধে ভুয়া চাকরির চুক্তি তৈরিতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তে মোট ১২ জন কথিত চক্রের সদস্য এবং ৬২ জন ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্টতা শনাক্ত করেছে পুলিশ। সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে খাবারের দোকান, রেস্তোরাঁ, বাড়িঘর সংস্কারের কোম্পানি এবং ধাতব কাজের ওয়ার্কশপ রয়েছে।
পুলিশের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কিছু অভিবাসী কাগজপত্র পাওয়ার পর বাস্তবে কাজ শুরু করলেও তাঁদের কাজের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শোষণের কাছাকাছি। আবার কিছু ক্ষেত্রে চাকরির সম্পর্ক অনুমতি পাওয়ার পরপরই শেষ হয়ে যেত। এমনকি কিছু চাকরি বাস্তবে কখনো শুরুই হয়নি।
২২৪টি চাকরির আবেদন, অনুমোদন পেয়েছিল ১০৮টি
মোসোসের তদন্তে ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত চক্রটির মাধ্যমে মোট ২২৪টি বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের আবেদন বা কন্ট্রাতাসিওন এন ওরিখেন প্রক্রিয়াকরণের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১০৮টি আবেদনে প্রশাসনিক অনুমোদন মিলেছিল।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই ১০৮টি অনুমোদিত আবেদনের মাধ্যমেই চক্রটি ৩২ লাখ ইউরোর বেশি অর্থ পেয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই হিসাবের মধ্যে বাতিল বা নাকচ হওয়া আবেদন এবং স্পেনে আগে থেকেই থাকা ব্যক্তিদের কাগজপত্র তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে নেওয়া অর্থ অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে চক্রটির মোট আর্থিক লেনদেন আরও বেশি হতে পারে।

এখানে উল্লেখযোগ্য, ২২৪টি আবেদনের সবগুলো অনুমোদন পায়নি। আবার প্রশাসনিক অনুমোদন পাওয়া মানেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বাস্তবে চাকরি পেয়েছেন, এমনটিও নয়।
২০১৯ সাল থেকে সক্রিয় ছিল চক্রটি
মোসোসের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা ডিআইসি-র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চক্রটি ২০১৯ সাল থেকেই সংগঠিতভাবে কাজ করছিল। কাতালোনিয়াকে কেন্দ্র করে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পাকিস্তানেও সহযোগী ছিল।
চক্রটির মধ্যে দায়িত্ব ভাগ করা ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। কেউ পাকিস্তানে থাকা আগ্রহী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করত, কেউ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করত, আবার অন্যরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি ও প্রশাসনিক আবেদন পরিচালনা করত। এভাবে চাকরির প্রকৃত সম্পর্ক না থাকলেও কাগজে বৈধ নিয়োগের চিত্র তৈরি করা হতো।
একটি গেস্তোরিয়ায় তল্লাশি থেকে তদন্তের সূত্রপাত
এই বড় তদন্তের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এর আগে বিদেশি নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘন, শ্রমিক শোষণ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগে পরিচালিত একটি পৃথক তদন্তের সময় বার্সেলোনার একটি গেস্তোরিয়া বা প্রশাসনিক সেবা প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালায় পুলিশ।
সেখান থেকে জব্দ করা কম্পিউটার, ডিজিটাল তথ্য ও নথিপত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের আবেদনে অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়। পরে তদন্তকারীরা ভুয়া চাকরির চুক্তির মাধ্যমে অভিবাসীদের স্পেনে আনা ও তাঁদের অবস্থান নিয়মিত করার কাজে যুক্ত একটি সংগঠিত চক্রের সন্ধান পান।
বার্সেলোনার ১০টি শহরে অভিযান, তিনজন কারাগারে
গত ২৬ ও ২৭ অক্টোবর দুই ধাপে অভিযান চালানো হয়। এতে মোসোসের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ৮১ জন পুলিশ সদস্য অংশ নেন।
বার্সেলোনা, ল’হসপিতালেত দে ইয়োব্রেগাত, বাদালোনা, সান্তা কোলোমা দে গ্রামেনেত, সান্ত আদ্রিয়া দে বেসোস, সাবাদেল, তেরাসা, ভিক, সান্ত বোই দে ইয়োব্রেগাত এবং সান্ত ভিসেনস দেলস হোর্তসসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্রেপ্তার করা হয় ৪৮ জন পুরুষ ও দুই নারীকে।
গ্রেপ্তার সাতজন কথিত চক্রের সদস্যের মধ্যে তিনজনকে বিচারিক সিদ্ধান্তে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে অপরাধী সংগঠনের সদস্য হওয়া, বিদেশি নাগরিকদের অধিকারবিরোধী অপরাধ এবং জাল নথি তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিদেশি নাগরিকদের অধিকারবিরোধী অপরাধ ও জাল নথি তৈরিতে সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত এখনো চলমান। বার্সেলোনার আদালতের তত্ত্বাবধানে এবং মানব পাচার ও অভিবাসনবিষয়ক প্রসিকিউটর কার্যালয়ের অংশগ্রহণে মামলাটির কার্যক্রম চলছে। আরও গ্রেপ্তারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি পুলিশ।
বৈধ নিয়োগের প্রক্রিয়াকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল?
স্পেনে বিদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের একটি বৈধ প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে কন্ট্রাতাসিওন এন ওরিখেন বলা হয়। এর মাধ্যমে স্পেনের কোনো নিয়োগকর্তা বিদেশে থাকা একজন কর্মীকে চাকরির প্রস্তাব দিতে পারেন এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে তাঁর কাজ ও বসবাসের অনুমতির প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন।
কিন্তু এই ব্যবস্থায় প্রকৃত চাকরির প্রস্তাব, নিয়োগকর্তার যোগ্যতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক শর্ত পূরণ করা জরুরি। তদন্তকারীদের অভিযোগ, আলোচিত চক্রটি এই বৈধ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কাগজে-কলমে চাকরির সম্পর্ক তৈরি করেছিল, যার সঙ্গে বাস্তব কর্মসংস্থানের মিল ছিল না।
ঘটনাটি অভিবাসীদের জন্যও সতর্কবার্তা। স্পেনে কাজ বা বসবাসের অনুমতি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কেউ যদি বিপুল অর্থ দাবি করে, তাহলে প্রতিষ্ঠান, চাকরির প্রস্তাব এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। কোনো মধ্যস্থতাকারীর আশ্বাস বা কাগজপত্র হাতে পাওয়াই বৈধ অনুমতি কিংবা প্রকৃত চাকরির নিশ্চয়তা নয়।
মোসোসের এই তদন্তে প্রতারণার অভিযোগে জড়িত ব্যবসায়ী ও মধ্যস্থতাকারীদের পাশাপাশি অভিবাসীদের শোষণের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো বিচারাধীন এবং আদালতে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন।
| তথ্যসূত্র: মোসোস দেস্কোয়াদ্রা, এজেন্সিয়া ইএফই, আরটিভিই, এল পাইস, বেতেভে, ২০ মিনিটোস।