ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য সাধারণত ভোটকেন্দ্রে সশরীরে উপস্থিত হতে হয়। তবে মহাকাশচারীদের ক্ষেত্রে রয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) অবস্থান করেও ভোট দিতে পারেন তাঁরা। এবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মহাকাশ থেকেই ভোট দিয়েছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাসার নভোচারী অনিল মেননসহ তিন মার্কিন মহাকাশচারী।
সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাঁদের ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। মহাকাশ স্টেশনে বসে সুরক্ষিত ইলেকট্রনিক ব্যালট পূরণ করে তা পৃথিবীতে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান তাঁরা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ব্যতিক্রমী ভোটদানের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন অনিল মেনন। এতে মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতার বিভিন্ন মুহূর্ত তুলে ধরেন তিনি। ভিডিওতে দেখা যায়, মহাকাশ স্টেশনে নিজের ক্রু কোয়ার্টারে অবস্থান করছেন মেনন। সেদিন তাঁর ওই কক্ষটিই সাময়িকভাবে ভোটকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
ভিডিওতে অনিল মেনন জানান, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি ভোট দিচ্ছেন। এ সময় ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও সংক্ষেপে তুলে ধরেন এই নভোচারী।
তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনি মহাকাশ থেকেও ভোট দিতে পারেন! মহাকাশ স্টেশনের তিনজন মার্কিন ক্রু সদস্যই ভোট দেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আমরা একটি ইলেকট্রনিক ব্যালট পূরণ করে তা নিরাপদে নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
মহাকাশে অবস্থান করেও ভোট দেওয়ার জন্য নভোচারীদের পৃথিবীতে ফিরে আসতে হয়নি। নাসার সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে পুরো প্রক্রিয়া।
প্রথমে মহাকাশচারীদের কাছে পাঠানো হয় নিরাপদ ইলেকট্রনিক ব্যালট। এরপর মহাকাশ স্টেশনের ল্যাপটপ ব্যবহার করে তাঁরা পছন্দের প্রার্থী কিংবা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। ভোট দেওয়া শেষ হলে পূরণ করা ব্যালট নাসার সুরক্ষিত যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। পরে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কর্মকর্তারা তা গ্রহণ করেন।
এই ব্যবস্থার ফলে পৃথিবী থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে থেকেও মহাকাশচারীরা নিজেদের নাগরিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় মহাকাশে অবস্থানের কারণে যাতে তাঁরা কোনো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ হারিয়ে না ফেলেন, সে লক্ষ্যেই চালু করা হয়েছে এই পদ্ধতি।
মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার ভিডিও প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া পড়ে। নভোচারীদের প্রযুক্তিনির্ভর এই ভোটদান পদ্ধতি দেখে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন। কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে মজার মন্তব্যও করেছেন।
একজন ব্যবহারকারী রসিকতা করে লিখেছেন, তিনজন নভোচারী মহাকাশ থেকে ভোট দিয়েছেন। অথচ তিনি মাত্র তিন ফুট দূরে থাকা ল্যাপটপের সঙ্গে প্রিন্টার সংযোগ করতে গিয়ে ৪০ মিনিট সময় ব্যয় করেছেন। তাঁর মতে, নাসার প্রযুক্তি অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য।
আরেকজন মন্তব্য করেছেন, মহাকাশ থেকে দেওয়া এই ভোটই হয়তো এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দূরবর্তী স্থান থেকে পাওয়া ‘আই ভোটেড’ স্টিকার। অন্য একজন জানিয়েছেন, মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার এমন ব্যবস্থা রয়েছে, তা তাঁর জানা ছিল না। বিষয়টিকে তিনি দারুণ বলেও উল্লেখ করেছেন।
তবে মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। নাসার এই বিশেষ ব্যবস্থা চালু হয়েছে ১৯৯৭ সাল থেকে। ওই বছর টেক্সাসের আইনসভা মহাকাশচারীদের মহাকাশে অবস্থান করেও ভোট দেওয়ার সুযোগ দিতে একটি বিল পাস করে।
এরপর একই বছর নাসার নভোচারী ডেভিড উলফ রাশিয়ার মির মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানকালে কক্ষপথ থেকে ভোট দেন। মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়া প্রথম মার্কিন নাগরিক হিসেবে পরিচিত তিনি।
দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানে অংশ নেওয়া নভোচারীরা যেন নিজ দেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশ থেকে ভোট দেওয়ার প্রক্রিয়াও এখন আরও সহজ ও নিরাপদ হয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করেও নাগরিক অধিকার প্রয়োগের এই সুযোগ মহাকাশ গবেষণার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।