স্পেনে মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ইসলামবিদ্বেষী তৎপরতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ২০২৫ সালে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও ঘৃণামূলক অপরাধসংক্রান্ত কার্যক্রম আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বার্সেলোনার সরকারি কৌঁসুলির দপ্তরের (ফিসকালিয়া দে বার্সেলোনা) বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামাজিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার বিস্তারকে এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছে সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর। একই সময়ে ইহুদিবিদ্বেষ ও সমকামীবিদ্বেষী তৎপরতাও বেড়েছে। তবে যৌন অভিমুখিতা ও জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্যের ঘটনা আগের মতোই রয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে দারিদ্র্য এবং রোমা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যের ক্ষেত্রেও।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশি ছড়াচ্ছে বিদ্বেষ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘৃণামূলক বক্তব্যের প্রায় সবই ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। এসব বক্তব্য প্রচারে অনেকে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার চেষ্টা করেন। ইসলামবিদ্বেষের ক্ষেত্রে অনলাইনে এমন তৎপরতা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
এখানে ইসলামবিদ্বেষ বলতে মুসলিম ধর্ম ও এর অনুসারীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষকে বোঝানো হয়েছে; ইসলামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শের সমালোচনাকে এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অনলাইনে বিদ্বেষ ছড়ানো ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশকে অনেক সময় কয়েক মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এর অন্যতম কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সহযোগিতার অভাব। তবে বিভিন্ন পোস্ট ও প্রকাশিত তথ্যের সূত্র ধরে কখনো কখনো ছদ্মনামের আড়ালে থাকা ব্যক্তিদের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে বৈষম্যের ঘটনা সবচেয়ে বেশি
২০২৫ সালে বার্সেলোনার ঘৃণামূলক অপরাধ ও বৈষম্যবিরোধী সরকারি কৌঁসুলির দপ্তরে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে যৌন অভিমুখিতার ভিত্তিতে বৈষম্য নিয়ে। এ ধরনের ঘটনা ছিল ৬১টি, যদিও ২০২৪ সালের তুলনায় তা কমেছে।
অন্যান্য অভিযোগের মধ্যে বিদেশিবিদ্বেষের ঘটনা ৪২টি এবং ইসলামবিদ্বেষের ঘটনা ২৭টি। এ ছাড়া রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে ১৮টি, লিঙ্গপরিচয়ের কারণে ১৩টি, বর্ণগত কারণে ১১টি এবং প্রতিবন্ধিতার কারণে নয়টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। অমুসলিম ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে পাঁচটি, ইহুদিবিদ্বেষের কারণে পাঁচটি এবং রোমা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বৈষম্যের ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘৃণা ছড়ানোর অভিযোগে তদন্ত ও বিচার
স্পেনের দণ্ডবিধির ৫১০ ধারার অধীনে ঘৃণা, শত্রুতা, বৈষম্য ও সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে ১৭টি তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্যে নয়টি ছিল ইসলামবিদ্বেষসংক্রান্ত। মোট ১২টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে ইন্টারনেট অথবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
এ ছাড়া বৈষম্যমূলক কারণে ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার অভিযোগে একই ধারার আরেকটি উপধারায় নয়টি তদন্ত শুরু হয়েছে। এর মধ্যে সাতটি ঘটনা ঘটেছে সরাসরি সামনাসামনি।
বৈষম্যের কারণে সরকারি সেবা দিতে অস্বীকৃতি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা প্রত্যাখ্যানের অভিযোগও তদন্তের আওতায় এসেছে। এসব ঘটনায় প্রতিবন্ধিতা, যৌন অভিমুখিতা ও ইহুদিবিদ্বেষের বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য। এমনকি বৈষম্যের কারণে ট্যাক্সিসেবা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগও রয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈষম্যমূলক উদ্দেশ্যে সংঘটিত সাধারণ অপরাধের ক্ষেত্রে ৩৪টি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সরাসরি বাস্তব পরিবেশে।
প্রথম পর্যায়ের ২৮টি আদালতের রায়ের মধ্যে ১০টি বিচারের পর দোষী সাব্যস্ত করার রায়, ১৪টি পক্ষগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে দণ্ডাদেশ এবং চারটি খালাসের রায় ছিল। এসব দণ্ডাদেশের মধ্যে তিনটি ছিল ইসলামবিদ্বেষসংক্রান্ত।
প্রতিবেদনটি স্পেনের কাতালোনিয়ায় ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য এবং অনলাইন বিদ্বেষের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা মোকাবিলায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যকর ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।
সূত্র: এসিএন (কাতালান সংবাদ সংস্থা), বার্সেলোনার সরকারি কৌঁসুলির দপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন।