দুই বছর আগে পূর্ব লন্ডনে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগের তদন্তে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে খুঁজছে যুক্তরাজ্যের পুলিশ। তাঁদের নাম ও ছবি প্রকাশ করে অবস্থান শনাক্ত করতে জনসাধারণের সহায়তা চেয়েছে লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ। পুলিশের ধারণা, তাঁদের একজন এখনো যুক্তরাজ্যে রয়েছেন, অন্যজন বাংলাদেশে চলে গিয়ে থাকতে পারেন। তাঁদের সন্ধান দিতে সহায়তা করলে সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পুরস্কারের ঘোষণাও রয়েছে।
গত ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ জানায়, সন্দেহভাজন দুই ব্যক্তি হলেন ৩১ বছর বয়সী শওকত আহমেদ এবং ৩৪ বছর বয়সী জাহিদুল হাসান জায়গীরদার। দুজনেরই পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকায় যোগাযোগ রয়েছে। শওকত আহমেদ যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন বলে পুলিশের ধারণা। অন্যদিকে জাহিদুল হাসান জায়গীরদার বাংলাদেশে চলে গিয়ে থাকতে পারেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট রাতে পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন এলাকায়। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। কিশোরীর দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, হোয়াইটচ্যাপেল রোডে দুই ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। পরে তাঁরা তাঁকে কাছের উইভার্স ফিল্ডস নামের একটি পার্কে নিয়ে যান। সেখানে তাঁকে ধর্ষণ করা হয় বলে অভিযোগ। পরে এক পথচারী কিশোরীটিকে দেখতে পেয়ে সহায়তা করেন।
ঘটনার পর থেকেই তদন্ত চালিয়ে আসছে মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দারা। তদন্তের অংশ হিসেবে এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁরা। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি না আসায় পুলিশ জনসাধারণের সহায়তা চেয়ে নতুন করে আবেদন জানায়।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর পুলিশ দুই ব্যক্তির সিসিটিভি ছবি প্রকাশ করে তাঁদের পরিচয় শনাক্তে সহায়তা চায়। ওই আবেদনের পর সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তদন্তে অগ্রগতি আনতে সহায়তা করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর ২৯ অক্টোবর দুই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করে তাঁদের অবস্থান শনাক্তে আবারও জনসাধারণের কাছে আবেদন জানানো হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বরের ওই প্রকাশ্য আবেদনের দিনই দুই ব্যক্তি পালিয়ে যান বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের খুঁজে বের করতে তদন্ত ও অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তের দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা কর্মকর্তা আনা ডেইটন বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর থেকে পুলিশ ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েছে। সেপ্টেম্বরে পুলিশের আবেদনে সাড়া দিয়ে যাঁরা তথ্য দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এসব তথ্য তদন্তকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে। দুই ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে যাঁদের কাছে কোনো তথ্য রয়েছে, তাঁদের দ্রুত পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে শওকত আহমেদ ও জাহিদুল হাসান জায়গীরদারকেও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
এদিকে স্বাধীন দাতব্য সংস্থা ক্রাইমস্টপার্স এই ঘটনায় দায়ীদের গ্রেপ্তার ও আদালতে দোষী সাব্যস্ত করতে সহায়তা করে—এমন তথ্যের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পুরস্কার ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তথ্যদাতারা চাইলে সম্পূর্ণ পরিচয় গোপন রেখে তথ্য দিতে পারবেন। তথ্যের জন্য তাঁদের নাম বা ব্যক্তিগত পরিচয় প্রকাশ করতে হবে না।
ঘটনার দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী কিশোরী ও তাঁর পরিবারের ওপর এর প্রভাব রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত চলাকালে পুলিশ নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে এবং বিশেষজ্ঞ সহায়তা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সেবা নিশ্চিত করেছে। গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত আবেদনে কিশোরীর পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার পর থেকে মেয়েটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং একা চলাফেরা করতে স্বস্তি বোধ করে না। পরিবারের সদস্যরা যথাসম্ভব তাঁর সঙ্গে থাকছেন। স্বাভাবিক কৈশোরের জীবন ও স্বাধীনতা এই ঘটনার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছে পরিবার।
পুলিশের সর্বশেষ আবেদনটি শুধু পুরোনো একটি অপরাধের তদন্তের খবর নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি গুরুতর মামলায় নতুন তথ্য পাওয়ার পর তদন্তকে পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ। বিশেষ করে সন্দেহভাজনদের একজন বাংলাদেশে অবস্থান করতে পারেন বলে পুলিশের ধারণা থাকায় বিষয়টি যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ—দুই দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যেও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে পুলিশের অনুসন্ধান ও অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। তদন্ত এখনো চলমান এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন।
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কারও কাছে তথ্য থাকলে যুক্তরাজ্যের ১০১ নম্বরে ফোন করে ০১/৬৬৮২৯৫/২৪ রেফারেন্স নম্বর উল্লেখ করতে হবে। পরিচয় গোপন রেখে তথ্য দিতে ক্রাইমস্টপার্সের ০৮০০ ৫৫ ১১১১ নম্বরেও যোগাযোগ করা যাবে।
সূত্র: লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ, আইটিভি নিউজ, ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড, বিডিনিউজ২৪।