জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ফ্রান্সের পাশাপাশি ইউরোপের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ ইতালিতেও বিক্ষোভ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ও প্রধান শিল্প-ফ্যাশন কেন্দ্র মিলানে টানা দুই দিনের বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর ৫০০ সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, দোকানপাটে লুটপাট ও সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনায় শহরের নিরাপত্তা জোরদার করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় শহরের অভিজাত বাণিজ্যিক এলাকার দোকানগুলো নির্ধারিত সময়ের আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি এ তথ্য জানান। তিনি ক্ষমতাসীন ডানপন্থি দল লিগের প্রধান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সালভিনি লেখেন, ‘কথা থেকে এবার কাজে মিলানকে রক্ষায় আরও ৫০০ সেনা।
মঙ্গলবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের জন্য উত্থাপন করা হতে যাওয়া নিরাপত্তাবিষয়ক পদক্ষেপের প্যাকেজে সেনা মোতায়েনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা রয়েছে।
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সোমবার মিলানের কেন্দ্রীয় এলাকার বিলাসবহুল পণ্যের দোকানগুলো আগেভাগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ইতালির আর্থিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত শহরটিতে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে, এমন আশঙ্কায় অনেক দোকানের জানালায় কাঠের পাটাতনসহ বিভিন্ন সুরক্ষাব্যবস্থা বসানো হয়।
মিলানের অভিজাত কেনাকাটার এলাকা ভিয়া মনতেনাপোলিওনে চ্যানেল, টিফানি ও ডিওরের মতো ব্র্যান্ডের বেশির ভাগ দোকান সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে শোকেস থেকে পণ্য সরিয়ে নেয়। এ সময় সড়কে পুলিশকে টহল দিতে দেখা যায়। পাশাপাশি কয়েকজন পর্যটকও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
শনিবার সরকারি সেবার মান ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে প্রথমে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে সপ্তাহান্তে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। কয়েকশ মুখোশধারী বিক্ষোভকারী, যাদের অনেককে অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে ধারণা করা হচ্ছে, শহরের কেন্দ্রে ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেন এবং বিভিন্ন দোকানে লুটপাট চালান।
টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা গেছে, লুটপাটের শিকার দোকানগুলোর মধ্যে ক্রীড়াসামগ্রী বিক্রেতা ডেকাথলন ও আর্ক’টেরিক্স এবং মোবাইল ফোন সেবাদাতা ভোডাফোনের প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এ ছাড়া লেভিস, আন্ডার আর্মার ও ডেকাথলনের মতো ব্র্যান্ডের দোকানগুলোর শোকেস কার্ডবোর্ড ও কাঠের প্যানেল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
আগামী বছর জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হতে যাওয়া ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। সোমবার মন্ত্রী ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে তিনি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী আন্তোনিও তায়ানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ‘রাষ্ট্রের ওপর এসব হামলার জবাব সরকার কঠোরভাবে দেবে। এর মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপও থাকবে।’
অপ্রাপ্তবয়স্কদের আগাম আটক রাখার সময়সীমা বাড়ানো এবং কিশোর অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদারের বিষয়টি বিবেচনা করছেন মেলোনি। পাশাপাশি পার্লামেন্টে পর্যালোচনাধীন একটি নিরাপত্তা বিলের কিছু বিধান দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগও নেওয়া হতে পারে।
ইতালির পুলিশ জানিয়েছে, রোববার মিলানে সহিংসতার ঘটনায় ২৭১ জন তরুণকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া আরও ২৮ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
শনিবার উত্তর ইতালির বোলোনিয়া, ব্রেশিয়া, বেরগামো ও তুরিনসহ কয়েকটি শহরেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রোববার প্রকাশিত পুলিশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় ২৮ জন বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ইতালির এই অস্থিরতার সঙ্গে প্রতিবেশী ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মিল রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান কমে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে শনিবার ফ্রান্সে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। কয়েক বছরের মধ্যে দেশটিতে সংঘটিত সবচেয়ে সহিংস বিক্ষোভগুলোর কয়েকটি সেদিন দেখা যায়।