গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন, ৫ আগস্ট বিকেলে যশোরের একটি বিলাসবহুল হোটেলে সংঘটিত হামলা, লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে একজন বিদেশি নাগরিকও ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেদিন প্রাণ হারানোদের মধ্যে বেশ কয়েকজন হামলাকারী হিসেবেও ওই হোটেলে প্রবেশ করেছিলেন।
এই ঘটনায় নিহত ২৪ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত জুলাই শহীদের তালিকায়। তবে এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর একজনের নাম বাতিল করা হয়েছে এবং বাকিদের বিষয়ে পুনরায় যাচাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রশাসন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদারের মালিকানাধীন হোটেলটিতে ওইদিন বিকেলে হামলা চালানো হয়। ভাঙচুর, লুটপাট শেষে ১৪ তলা ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিল বের হয় এবং শাসক দলের নেতাদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়।
একজন স্থানীয় সাংবাদিক জানান, মোটরসাইকেলযোগে মিছিলে অংশ নিয়ে কয়েকজন সরাসরি হোটেলে ঢুকে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই অনেকেই ভেতর থেকে চেয়ার-টেবিলসহ নানা জিনিসপত্র বের করে আনে। পরে আগুন লাগানো হলে শুরুতে দমকল বাহিনীকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কয়েক ঘণ্টা পর ভিতরে নিজেদের মানুষ আটকা পড়েছে জেনে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়।
এমন ঘটনায় নিহতদের শহীদ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা কতটা ন্যায্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শুধু যশোর নয়, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের তালিকার আরও অনেক নাম নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনে সরাসরি অংশ না নিয়েও অনেকের নাম তালিকায় যুক্ত হয়েছে, যার মাধ্যমে তারা সরকারি নানা সুবিধা পাচ্ছেন।
সরকারি ঘোষণায় নিহতদের পরিবার এককালীন ৩০ লাখ টাকা, মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা ও বিনামূল্যে ফ্ল্যাট সুবিধা পাচ্ছেন। আহতদের ক্যাটাগরি অনুযায়ী মাসে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ভাতা, অঙ্গহানির ক্ষেত্রে এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা সুবিধা এবং চাকরিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

যশোরের জেলা প্রশাসক মো. আজহারুল ইসলাম জানান, শহীদ ও আহতদের তালিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় ওই হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের বিষয়েও নতুন করে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে তালিকা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৮৩৪ জনকে শহীদ হিসেবে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরে আরও ১০ জন যোগ হওয়ায় সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৪৪ জনে। তবে ভুল ও পুনরাবৃত্ত নাম থাকার কারণে আগস্টে আটজনের নাম বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে শহীদের সংখ্যা ৮৩৬। আহতদের প্রথম তালিকায় ছিল ১২ হাজার ৪৩ জনের নাম, পরবর্তীতে আরও ১ হাজার ৭৫৭ জন যুক্ত হওয়ায় সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৮০০ জনে।

তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ফারুক ই আজম বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রেরিত তথ্যের ভিত্তিতেই শহীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া চলমান আছে।
২০২৫ সালের “জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন অধ্যাদেশ” অনুযায়ী, শুধু সেইসব মানুষই তালিকাভুক্ত হতে পারবেন যারা তৎকালীন সরকারের বাহিনী বা শাসক দলের সদস্যদের আক্রমণে নিহত বা আহত হয়েছেন।
তবে প্রকাশিত তালিকায় এই সংজ্ঞার বাইরে থাকা ব্যক্তিদের নামও উঠে এসেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সমালোচনার মুখে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভুয়া শহীদ বা যোদ্ধাদের শনাক্ত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে যারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে অর্থসুবিধা নিয়েছেন, তাদের কাছ থেকে সেই অর্থ ফেরত আদায় করা হবে।
মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. ফারুক ই আজম জানান, “এটি চলমান প্রক্রিয়া। প্রতিটি নাম পৃথকভাবে যাচাই করা হচ্ছে। ভুয়া প্রমাণিত হলে তারা বাদ পড়বেন এবং নতুন করে গেজেট প্রকাশ করা হবে।”