বার্সেলোনাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ শহরে পরিণত করতে বড় ধরনের ডিজিটাল রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষ। এর অংশ হিসেবে শহরজুড়ে নজরদারি ক্যামেরার সংখ্যা ১০ গুণ বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ১৮টি ভার্চুয়াল সহকারী চালু এবং পুরো নগরের তথ্যকে একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থায় যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শুধু নাগরিক সেবা দ্রুত করার জন্য নয়, শহরের যান চলাচল, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, নগর অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকেও একই প্রযুক্তিগত কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা করছে বার্সেলোনা সিটি কাউন্সিল।
বার্সেলোনা সিটি কাউন্সিলের প্রধান তথ্যপ্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিআইও) এবং ইনস্টিটিউট মিউনিসিপাল বার্সেলোনা ইনোভাসিও ই টেকনোলজিয়া (বিআইটি)-এর ব্যবস্থাপক এমিলি রুবিও সম্প্রতি আসলান আয়োজিত ২০তম প্রযুক্তি সম্মেলনে নগরের এই পরিকল্পনার কথা জানান।
১০ গুণ বাড়বে নজরদারি ক্যামেরা
বার্সেলোনার প্রযুক্তি পরিকল্পনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো শহরজুড়ে নজরদারি ক্যামেরার নেটওয়ার্ক বড় করা।
নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানের তুলনায় ১০ গুণ বেশি নজরদারি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এসব ক্যামেরার ভিডিও দেখার জন্য একটি সুরক্ষিত কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্মও তৈরি করা হবে।
প্রাথমিকভাবে এই ব্যবস্থা গুয়ার্দিয়া উরবানা পুলিশের কাজে ব্যবহার করা হবে। পরে বার্সেলোনার নগর ব্যবস্থাপনা ও চলাচলের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য সংস্থা, যেমন বিএসএম, এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
নগর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ভবিষ্যতে শহরের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হয়ে উঠবে।
শহরের সব তথ্য এক প্ল্যাটফর্মে
বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষ একই সঙ্গে একটি নতুন কেন্দ্রীয় তথ্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন পৌর সংস্থা ও নগর ব্যবস্থাপনার তথ্য এক জায়গায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রথম পর্যায়ে নগর চলাচল বা মোবিলিটি-সংক্রান্ত তথ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
শহরের বিভিন্ন স্থানে থাকা সেন্সর থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে যান চলাচল, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ পরিমাপের সেন্সর। এমনকি শহরের লিফট ও চলন্ত সিঁড়ির মতো অবকাঠামো থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।
এর লক্ষ্য হলো কোনো যন্ত্র বা অবকাঠামোতে সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত তা শনাক্ত করা এবং শহরের পরিষেবাগুলোকে আরও কার্যকর ও স্থিতিশীল করা।
সংগৃহীত কিছু তথ্য নাগরিক ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে নগর কর্তৃপক্ষ আশা করছে, এসব তথ্য ব্যবহার করে বেসরকারি খাত নতুন প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা তৈরি করতে পারবে।
ছয় মাসে আসছে ১৮টি এআই সহকারী
নগর কর্তৃপক্ষের আরেকটি বড় পরিকল্পনা হলো নাগরিক সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৮টি এআইভিত্তিক চ্যাটবট বা ভার্চুয়াল সহকারী চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এরই মধ্যে আবাসনবিষয়ক ওয়েবসাইটে হ্যাবট ২.০ নামে একটি ভার্চুয়াল সহকারী চালু হয়েছে। ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকরা বাড়িভাড়া, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া, বিভিন্ন প্রশ্ন এবং সরকারি সহায়তা সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পেতে এটি ব্যবহার করতে পারেন।
নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ব্যবহারকারীদের নিয়ে পরীক্ষামূলক পর্যায়ে এই ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতার হার ছিল ৮৫ শতাংশ।
শুধু প্রযুক্তি নয়, সাইবার নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগ
তবে শহর যত বেশি ডিজিটাল হচ্ছে, ততই বাড়ছে সাইবার হামলার ঝুঁকি।
কাতালোনিয়ার সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলেনা রদ্রিগেস জানিয়েছেন, ২০২৫ সালে কাতালোনিয়ায় ৬ হাজার ৫৪৪টি সাইবার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ।
সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি হলো তথ্য জিম্মি করে অর্থ দাবি এবং তথ্য চুরি।
হ্যাকাররা শুধু তথ্য চুরি করেই থেমে থাকছে না; অনেক ক্ষেত্রে চুরি করা তথ্য প্রকাশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ভুক্তভোগীর ওপর চাপ তৈরি করছে।
পরিচয় জালিয়াতি বেড়েছে ১৬০ শতাংশ
কাতালোনিয়ার সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে পরিচয় জালিয়াতির ঘটনা ১৬০ শতাংশ বেড়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি আরও বিশ্বাসযোগ্য প্রতারণা।
আগের তুলনায় এখন প্রতারকরা এআই ব্যবহার করে এমন লিখিত বার্তা, কণ্ঠস্বর, ভিডিও ও অডিও তৈরি করতে পারছে, যা দেখে বা শুনে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য করা কঠিন।
ফলে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্য ও সরকারি অবকাঠামো সুরক্ষিত রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুরো শহরই যখন ‘ডিজিটাল সিস্টেম’
বার্সেলোনা সিটি কাউন্সিলের সিআইও এমিলি রুবিওর মতে, তাদের সাইবার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আলাদা।
কারণ শুধু কম্পিউটার বা সরকারি তথ্যভাণ্ডার নয়—শহরের রাস্তায় থাকা ইলেকট্রনিক ও ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি অবকাঠামোও সম্ভাব্য ঝুঁকির অংশ।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের বার্সেলোনায় ট্রাফিক সিগন্যাল, ক্যামেরা, সেন্সর, লিফট, চলন্ত সিঁড়ি থেকে শুরু করে নাগরিক সেবার বিভিন্ন ব্যবস্থা একই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
তাই একটি জায়গায় সাইবার হামলা হলে তার প্রভাব শুধু একটি অফিসের কম্পিউটারে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে।
এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নগর কর্তৃপক্ষ সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি পুরো সরকারি খাতের জন্য একটি সাইবার নিরাপত্তা পরিচালনা কেন্দ্র বা এসওসি তৈরির পরিকল্পনা করছে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তনের ফলে বার্সেলোনা একদিকে যেমন দ্রুততর ও স্মার্ট নগর ব্যবস্থাপনার দিকে এগোবে, অন্যদিকে নাগরিকদের তথ্যের নিরাপত্তা এবং শহরজুড়ে বাড়তে থাকা নজরদারি নিয়ে নতুন প্রশ্নও সামনে আসবে।
| তথ্যসূত্র: মেট্রোপলি আবিয়ের্তা