মিশরের বন্দরনগরী আলেকজান্দ্রিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কর্মরত প্রায় ২২০ জন বাংলাদেশি শ্রমিক চরম আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। টানা তিন মাস ধরে তাদের বেতন বন্ধ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি অন্তত ১৬০ জন শ্রমিকের পাসপোর্ট আটকে রাখার অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
শ্রমিকদের দাবি, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ (পাসপোর্ট নম্বর: A20851591) নামে এক বাংলাদেশি সাব-কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে তারা ‘শাইনলার ইজিপ্ট’ নামের একটি পোশাক কারখানায় কাজ করছেন। দীর্ঘদিন ধরে বেতন না দেওয়া, পাসপোর্ট ফেরত না দেওয়া, ওয়ার্ক পারমিট করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং পাওনা চাইলে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে ওই সাব-কন্ট্রাক্টরের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বকেয়া বেতন ও পাসপোর্ট ফেরত চাইতে গিয়ে কয়েকজন শ্রমিক পুলিশি হয়রানি ও গ্রেপ্তারের হুমকির মুখে পড়েছেন।
কারখানাটিতে অপারেটর হিসেবে কর্মরত শুভ নামে এক শ্রমিক বলেন, “আমি আব্দুল্লাহর কন্ট্রাক্ট লাইনে সাত মাস ধরে কাজ করছি। প্রথম চার মাসের বেতন পেলেও গত তিন মাসের টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া ও পাসপোর্ট ফেরত চাইলে তিনি ভয়ভীতি দেখান এবং পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে শারীরিক নির্যাতনের হুমকি দেন।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের অন্তত ১৬০ জনের পাসপোর্ট তাঁর কাছে রয়েছে। তিন মাস ধরে বেতন না থাকায় দেশে পরিবারকে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা, এখানে নিজেদের খাবার ও বাসাভাড়ার খরচ চালানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী জানান, গত সপ্তাহে বকেয়া বেতন ও পাসপোর্টের বিষয়ে কথা বলতে ২৫-৩০ জন শ্রমিক কারখানার অফিসে কোয়ালিটি ম্যানেজার মোহাম্মদ সালাহর সঙ্গে দেখা করেন। সালাহ তাদের জানান, অফিসে ৭৫টি পাসপোর্ট রয়েছে এবং তাদের নামে ভিসা হয়েছে। তবে সেই ভিসা দেখাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। বকেয়া বেতনের বিষয়ে সালাহর দাবি, কারখানার পক্ষ থেকে আব্দুল্লাহর সমস্ত পাওনা মেটানো হয়েছে এবং কারখানার কাছে শ্রমিকদের কোনো বকেয়া নেই।
রাদোয়ন উল্লাহ নামের অপর এক শ্রমিক অভিযোগ করে বলেন, “কুমিল্লার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরে মিশরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করছেন। শুরুতে নিয়মিত বেতন দিলেও পরে একসঙ্গে ৫০ থেকে ১০০ জন শ্রমিকের বেতন আটকে দেওয়া তাঁর পুরোনো কৌশল। তিনি শ্রমিকদের পাওনা না দিয়ে আটকে রাখেন এবং পাসপোর্ট জব্দ করেন।”
অভিযোগ রয়েছে, অধিকার দাবি করলে স্থানীয় পুলিশ দিয়ে ধরিয়ে দেওয়া বা কক্ষে আটকে রেখে মারধর করার হুমকি দেওয়া হয়। সাহেব খান নামে এক শ্রমিক বলেন, “আব্দুল্লাহ মিশরে বিয়ে করেছেন। বেতন ও পাসপোর্ট ফেরত চাইলে তিনি স্থানীয় আত্মীয়স্বজনদের দিয়ে আমাদের মারধরের হুমকি দেন। নতুন হওয়ার কারণে অনেকেই ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না।
এ বিষয়ে দূতাবাসের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
এমতাবস্থায় আটকে থাকা পাসপোর্ট উদ্ধার, বকেয়া বেতন আদায় এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কায়রোস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের আকুল আবেদন জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। প্রবাসীরা জানান, বিদেশের মাটিতে তাদের আইনগত সুরক্ষা ও ন্যায্যতা পেতে দূতাবাসই এখন একমাত্র ভরসা।
দূতাবাস ও কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য,যোগাযোগ করা হলে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, “আমরা অভিযোগ পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট সাব-কন্ট্রাক্টর আব্দুল্লাহকে বেশ কয়েকবার ফোন করে দূতাবাসে আসতে বলা হলেও তিনি আসেননি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাহায্য নিয়ে পাসপোর্ট উদ্ধার ও সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
দূতাবাস সূত্রে আরও জানা যায়, ভুক্তভোগী কর্মীরা প্রতিকার চেয়ে আবেদন করেছেন। আবেদনের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বিষয়টি মিশরের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কারখানা কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে নিষ্পত্তির আওতায় পড়ে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে সাব-কন্ট্রাক্টর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
প্রেক্ষাপট উল্লেখ্য, কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং স্থানীয় বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণে ২০১৬ সাল থেকে মিশরে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নবায়ন করা হয়নি। ফলে বাংলাদেশিদের জন্য সরাসরি ওয়ার্ক পারমিট ভিসা মূলত বন্ধ রয়েছে।
তবে চাহিদা থাকায় অনেকে ভিজিট ভিসায় মিশরে এসে পরবর্তীতে বিভিন্ন কারখানায় কাজ নেন। নির্ধারিত সময়ে ভিসা নবায়ন না করলে তারা অবৈধ হয়ে পড়েন। অবশ্য নিয়োগকর্তার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বাংলাদেশ দূতাবাসের ‘নোট ভারবাল’ সহ আবেদন করলে যাচাই-বাছাই শেষে ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে