সমুদ্রের ঢেউ আর উপকূলের ক্ষয় ধীরে ধীরে সরিয়ে দিচ্ছিল মাটির স্তর। আর সেই ক্ষয়ের মধ্যেই হঠাৎ প্রকাশ্যে আসে মানুষের হাড়গোড়। স্পেনের তেনেরিফে এমনই এক রহস্যময় আবিষ্কার ঘিরে এখন ব্যস্ত প্রত্নতাত্ত্বিকরা।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের তেনেরিফে গারাচিকো এলাকার ব্যারানকো হোন্দো সৈকতের কাছের উপকূলে সমুদ্রের ক্ষয়ের কারণে মাটির বাইরে বেরিয়ে এসেছিল মানুষের দেহাবশেষ। বিষয়টি জানার পর জরুরি ভিত্তিতে সেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞরা দেহাবশেষগুলো উদ্ধার করে নিরাপদে সরিয়ে নেন।
কিন্তু কঙ্কালটি আসলে কার?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনও মেলেনি।
প্রত্নতাত্ত্বিকদের হাতে আপাতত একাধিক সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, এটি স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ বা নিহত কোনো ব্যক্তির দেহাবশেষ হতে পারে। সেই ধারণা থেকেই উদ্ধারকাজ শুরু হয়েছিল।
কিন্তু খনন যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে অন্য সম্ভাবনাও।
বিশেষজ্ঞরা এখন মনে করছেন, এটি বহু পুরোনো কোনো মহামারির শিকার ব্যক্তির দেহাবশেষও হতে পারে। এমনকি গারাচিকোতে অতীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ বন্যার সময় মারা যাওয়া কোনো ব্যক্তির দেহাবশেষ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।
সমুদ্রই কি খুলে দিল বহু বছরের পুরোনো রহস্য?
দেহাবশেষগুলো পাওয়া গেছে উপকূলের এমন একটি অংশে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রের ক্ষয় চলছে। ঢেউ ও সামুদ্রিক ক্ষয়ের কারণে উপকূলের মাটির স্তর সরে যাওয়ায় এতদিন চাপা থাকা হাড়ের অংশ ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে।
এই কারণেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। শুধু কঙ্কাল উদ্ধার করাই তাদের লক্ষ্য নয়। কঙ্কালটি ঠিক কোথায়, কী ধরনের মাটির স্তরে এবং আশপাশে কী কী উপাদানের সঙ্গে পাওয়া গেছে- এসব তথ্যও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
কারণ অনেক সময় একটি হাড়ের বয়স জানার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেটি কোন পরিবেশে এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছেছিল।
এ কারণেই উদ্ধারকাজে শুধু হাড় সংগ্রহ করা হয়নি। মাটিও পরীক্ষা করে রাখা হয়েছে এবং পুরো জায়গাটির ছবি ও ত্রিমাত্রিক নথি তৈরি করা হয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে খনন করে যতটা সম্ভব তথ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
গৃহযুদ্ধ, মহামারি নাকি ভয়াবহ বন্যা?
এই তিনটি সম্ভাবনাই এখন তদন্তের কেন্দ্রে।
যদি এটি স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়ের কোনো দেহাবশেষ হয়, তাহলে কঙ্কালটি দেশটির অশান্ত রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
আবার যদি এটি মধ্যযুগের কোনো মহামারির শিকার ব্যক্তির দেহাবশেষ হয়, তাহলে এর সঙ্গে গারাচিকোর বহু পুরোনো জনজীবন ও রোগব্যাধির ইতিহাসের সম্পর্ক পাওয়া যেতে পারে।
আর যদি এটি কোনো ঐতিহাসিক বন্যার সময় মারা যাওয়া ব্যক্তির দেহাবশেষ হয়, তাহলে সেটি গারাচিকোর উপকূলীয় দুর্যোগের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য দিতে পারে।
এই মুহূর্তে অবশ্য কোনোটিকেই সত্য বলে ঘোষণা করার সুযোগ নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক ও জীব-নৃতাত্ত্বিক পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত সব সম্ভাবনাই খোলা রাখা হচ্ছে।
ল্যাবরেটরিতে মিলবে আসল উত্তর
উদ্ধার করা দেহাবশেষ এখন বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও জীব-নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর বয়স, প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য ঐতিহাসিক সময়কাল নির্ধারণের চেষ্টা করা হবে।
একই সঙ্গে দেহাবশেষের সঙ্গে পাওয়া মাটি ও অন্যান্য উপাদানও পরীক্ষা করা হবে। এসব তথ্য একত্র করে গবেষকরা বোঝার চেষ্টা করবেন- মানুষটি কখন মারা গিয়েছিলেন এবং কী পরিস্থিতিতে তার দেহ ওই স্থানে পৌঁছেছিল।
গারাচিকোর এই উপকূলে মানুষের দেহাবশেষ পাওয়ার ঘটনা অবশ্য একেবারে নজিরবিহীন নয়। ইসলা বাইহা অঞ্চলের বিভিন্ন উপকূলীয় স্থানে বহু বছর ধরেই মানুষের দেহাবশেষের উপস্থিতির কথা নথিভুক্ত রয়েছে। তবে নতুন এই আবিষ্কারের নির্দিষ্ট সময়কাল ও পরিচয় এখনও অজানা।
সমুদ্রের নিচে আর কী লুকিয়ে আছে?
এই আবিষ্কারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক হয়তো এখানেই।
উপকূলের ক্ষয় সাধারণত মানুষের কাছে ভাঙন, ঝুঁকি বা পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে ধরা পড়ে। কিন্তু একই প্রক্রিয়া কখনও কখনও মাটির নিচে শত শত বছর ধরে লুকিয়ে থাকা ইতিহাসও সামনে নিয়ে আসে।
গারাচিকোর এই কঙ্কাল তারই একটি উদাহরণ।
আজ যে জায়গায় সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে, সেখানে হয়তো বহু বছর আগে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিবেশ ছিল। কোনো মানুষের জীবন, মৃত্যু কিংবা কোনো ঐতিহাসিক দুর্যোগের সঙ্গে যুক্ত একটি ঘটনা সময়ের সঙ্গে মাটির নিচে হারিয়ে গিয়েছিল। তারপর উপকূল ক্ষয় হতে হতে একদিন সেটিই আবার মানুষের সামনে ফিরে এসেছে।
এখন প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাজ হলো সেই হারিয়ে যাওয়া গল্পটির সূত্রগুলো একে একে খুঁজে বের করা।
কঙ্কালটি কত বছরের পুরোনো? মানুষটি কে ছিলেন? কীভাবে তার দেহ সেখানে পৌঁছেছিল? এই তিন প্রশ্নের উত্তর মিলবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও পরবর্তী গবেষণায়। আর সেই ফলই নির্ধারণ করবে- গারাচিকোর সমুদ্রতীরে পাওয়া এই কঙ্কাল আসলে কত বছরের পুরোনো এক ইতিহাসের দরজা খুলেছে।