হেমন্ত আসলেই বাংলাদেশে যেমন ধান কাটা শুরু হয়, চরাচরে কৃষক-কৃষাণী ব্যস্ত হয়ে পড়েন ধান তোলার কাজে। ঠিক তেমনি স্পেনের অতীত ঐতিহ্যে ছিলো সুন্দর কৃষিজীবন। এব্রো নদীর পাড় ঘিরে পলি পড়া চাষ জমিতে সোনালী ধানের চাষ হতো। এখনো সেখানে কৃষি কাজ হয়, ধান ফলায় কৃষকরা। সময়ের সাথে সেটা অনেক কমে এসেছে, আবহ পরিবর্তন হয়েছে, আধুনিক হয়েছে কৃষি সারঞ্জাম। তবে সেই সোনালী অতীতকে মনে করতে এখনো উৎসবের আয়োজন করে দেশটি।
তারই অংশ হিসেবে কাতালোনিয়ার ডেল্টা দে ল’এব্রোতেও ধান কাটার সময়কে ঘিরে তৈরি হয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি ও উৎসব। সেই ঐতিহ্যকে জীবন্ত করে তুলতেই আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর লা রাপিতায় অনুষ্ঠিত হবে ‘ফেস্তা দে লা সেগা দে ল’আরোস’—ঐতিহ্যবাহী ধান কাটার নবান্ন উৎসব।

কাতালোনিয়ার ডেল্টা দে ল’এব্রোর বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও ধানক্ষেত ঘিরে গড়ে ওঠা এই কৃষি ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু প্রজন্মের মানুষের জীবন, শ্রম ও সংস্কৃতি। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার শুরুর আগে কৃষকেরা কীভাবে হাতে হাতে ধান কাটতেন, সেই পুরোনো পদ্ধতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরাই এই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
আগামী শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর লা রাপিতার রোতুলা দেলতা এলাকায় অনুষ্ঠিত হবে এবারের মূল আয়োজন। ভিয়া ভের্দে ও মার দে ল’এব্রে জাদুঘরের কাছাকাছি এই স্থানে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলবে ঐতিহ্যবাহী ধান কাটার প্রদর্শনী। দর্শনার্থীরা শুধু এই কৃষিকাজ দেখার সুযোগই পাবেন না, বরং আয়োজকদের ব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্যবাহী ধান কাটার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগও থাকবে।
উৎসবটি সব বয়সী মানুষের জন্য উন্মুক্ত। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটক ও পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থীরাও এতে অংশ নিতে পারবেন। বিশেষ করে শিশুদের কাছে এটি হতে পারে কাতালোনিয়ার কৃষি ঐতিহ্যকে কাছ থেকে জানার একটি ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা।
মাঠ থেকে খাবারের টেবিলে:
ধান কাটার ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে স্থানীয় খাবারের আয়োজনও। দুপুর ১টার পর থাকবে বিশেষ সংহতি-ভিত্তিক চালের খাবারের আয়োজন। মাত্র ৫ ইউরোর বিনিময়ে পাওয়া যাবে এক পরিবেশন চালের খাবার, এক বোতল পানি এবং একটি ঐতিহ্যবাহী পাস্তিসেত।
এই খাবারের পুরো অর্থ দান করা হবে প্রজেক্টে এম্মা-কে, যা ক্যান্সার গবেষণায় সহায়তা করে। তবে এই খাবারের আয়োজনে অংশ নিতে হলে আগাম রিজার্ভেশন করতে হবে।

উৎসবকে ঘিরে থাকবে সংগীত ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনও। ফলে ধান কাটার পুরোনো কৃষিপদ্ধতি দেখার পাশাপাশি দর্শনার্থীরা স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
ধানচাষের ঐতিহ্য ধরে রাখার আয়োজন:
ডেল্টা দে ল’এব্রোর কৃষি সংস্কৃতিতে ধান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানকার ঐতিহ্যবাহী ধানচাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বছরের বিভিন্ন পর্যায়ের কৃষিকাজ। ধান রোপণ থেকে শুরু করে ফসল কাটা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে নানা রীতি ও উৎসব।
এর মধ্যে ‘প্লান্তাদা’ হলো ধানের চারা রোপণের ঐতিহ্যবাহী আয়োজন, আর ‘সেগা’ হলো ধান কাটার উৎসব। অর্থাৎ ১৯ সেপ্টেম্বরের লা রাপিতার আয়োজনটি মূলত সেই কৃষি-চক্রের ফসল কাটার পর্যায়কে সামনে নিয়ে আসে।

আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কারণে মাঠে কাজের ধরন বদলে গেলেও এই উৎসবের মাধ্যমে পুরোনো কৃষিপদ্ধতি, কৃষকের শ্রম এবং ধানচাষকে ঘিরে গড়ে ওঠা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে।
ডেল্টাজুড়ে ‘সেগা’ উৎসব:
লা রাপিতার এই আয়োজনটি একক কোনো উৎসব নয়। ডেল্টা দে ল’এব্রোর বিভিন্ন শহর ও গ্রামে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরজুড়ে ধারাবাহিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ‘সেগা’ উৎসব।
২০২৬ সালের আয়োজনের মধ্যে সান্ত জাউমে দ’এনভেজা, দেলতেব্রে, লা রাপিতা, ল’আমপোল্লা, কামার্লেস, ল’আলদেয়া ও আম্পোস্তাসহ বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে পৃথক অনুষ্ঠান রাখা হয়েছে।
এই ধারাবাহিক আয়োজনকে ‘রুতা দে লা সেগা’ বা ধান কাটার ঐতিহ্যবাহী পথ হিসেবেও তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে পুরো ডেল্টা অঞ্চলের কৃষি, সংস্কৃতি, স্থানীয় খাবার ও ঐতিহ্যকে দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

ধানকে ঘিরে নবান্নের আয়োজন:
ধান কাটার উৎসবের পাশাপাশি ডেল্টা দে ল’এব্রোতে চলছে চালভিত্তিক বিশেষ খাদ্য উৎসবও। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত লা রাপিতা, দেলতেব্রে, আম্পোস্তা ও ল’আমপোল্লার বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ডেল্টার চাল দিয়ে বিশেষ মেনু পরিবেশন করা হচ্ছে।
ফলে সেপ্টেম্বরের এই সময়টিতে ডেল্টা দে ল’এব্রো ভ্রমণ করলে একই সঙ্গে দেখা যাবে ধান কাটার ঐতিহ্য, উপভোগ করা যাবে স্থানীয় সংস্কৃতি এবং স্বাদ নেওয়া যাবে এই অঞ্চলের বিখ্যাত চালের তৈরি খাবার।
দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য-
অনুষ্ঠান: ফেস্তা দে লা সেগা দে ল’আরোস- ঐতিহ্যবাহী ধান কাটার উৎসব
তারিখ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সময়: সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা
স্থান: রোতুলা দেলতা, লা রাপিতা
কাছাকাছি: ভিয়া ভের্দে ও মার দে ল’এব্রে জাদুঘর
প্রবেশ: মূল অনুষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত
অংশগ্রহণ: ঐতিহ্যবাহী ধান কাটার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ
দুপুরের খাবার: দুপুর ১টার পর
মূল্য: ৫ ইউরো
খাবারের সঙ্গে: চালের খাবার, পানি ও পাস্তিসেত
উপার্জনের পুরো অর্থ: প্রজেক্টে এম্মা ক্যান্সার গবেষণায় খরচ করা হবে
খাবারের জন্য: আগাম রিজার্ভেশনের প্রয়োজন হবে।
বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে হলেও ধানকে ঘিরে কাতালোনিয়ার এই আয়োজনের মধ্যে তাই খুঁজে পাওয়া যায় বাংলাদেশের মানুষের কাছেও পরিচিত এক আবেগ মাটি, কৃষক আর ফসলের সম্পর্ক। সময় বদলেছে, কৃষির পদ্ধতি বদলেছে; কিন্তু ফসল ঘরে তোলার আনন্দ আর সেই কৃষিজীবনের স্মৃতি এখনো মানুষের সংস্কৃতিতে বেঁচে আছে। লা রাপিতার ‘সেগা’ উৎসব সেই স্মৃতিকেই নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি প্রয়াস।