স্পেনের সেউতায় জুলাইয়ের শেষ দিকে ঘটে যাওয়া ব্যাপক অভিবাসী প্রবেশের ঘটনায় এখন শুধু মরক্কোর ভূমিকা নয়, স্পেনের প্রস্তুতি ও সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দেশটির জাতীয় আদালতের তদন্তে সামনে এসেছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- এত বড় আকারের প্রবেশের পরিকল্পনা কারা করেছিল এবং স্পেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগেই সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নিয়েছিল?
মামলাটির তদন্ত করছেন জাতীয় আদালতের বিচারক মারিয়া তারদোন। তাঁর হাতে এখন দুটি আলাদা তদন্তের সূত্র। একটি হলো সেউতায় ব্যাপক অভিবাসী প্রবেশের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের পেছনে কারা ছিল, তা খুঁজে বের করা। অন্যটি হলো- স্পেনের ভূখণ্ডে থাকা কর্তৃপক্ষের কাছে আগে থেকেই কোনো সতর্কবার্তা ছিল কি না এবং থাকলে তারা সেই অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছিল কি না।
তদন্তের দ্বিতীয় দিকটি ইতোমধ্যে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রকাশ করা সরকারি নথি অনুযায়ী, স্পেনের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিএনআই ২৯ জুলাই সতর্ক করেছিল যে পরদিন সেউতায় ব্যাপকভাবে প্রবেশের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চলছে। দুটি ফেসবুক গ্রুপে এ ধরনের আহ্বান জানানো হচ্ছিল, যেগুলোর সম্মিলিত অনুসারী ছিল প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার।
সিএনআই এই তথ্য শুধু স্পেনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই নয়, মরক্কোর গোয়েন্দা সংস্থা, সেউতায় সরকারের প্রতিনিধি এবং স্পেনের সিভিল গার্ডকেও জানিয়েছিল।
তাহলে প্রশ্ন উঠছে- সতর্কবার্তা পাওয়ার পর কী হয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তদন্তকারীদের নজরে এসেছে সেউতায় সরকারি প্রতিনিধির কার্যালয়ের দুই কর্মকর্তার পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। কার্যালয়ের প্রধান কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তিনি সিএনআইয়ের সতর্কবার্তাটি সরকারি প্রতিনিধি মিগেল আনহেল পেরেস ত্রিয়ানোকে পাঠিয়েছিলেন। তবে ত্রিয়ানো তা অস্বীকার করেছেন।
এই বিরোধ মেটাতে দুজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, গোয়েন্দা তথ্যটি শেষ পর্যন্ত কার কাছে পৌঁছেছিল এবং সরকারের কোন পর্যায় পর্যন্ত সেই সতর্কবার্তা গিয়েছিল।
যদি প্রমাণ হয়, সীমান্ত নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তা ব্যাপক প্রবেশের আশঙ্কা সম্পর্কে আগে থেকেই জানতেন, কিন্তু তা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেননি, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ উঠতে পারে। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে এমন কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়নি।
অন্যদিকে, ঘটনার পরিকল্পনার পেছনে মরক্কোর ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে।
বিচারক তারদোনের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল বলে ধারণা করা হয়েছে। তবে এর পেছনে প্রচলিত মানবপাচারকারী চক্রকে দায়ী করার মতো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। বিচারকের মতে, ওই অঞ্চলে সক্রিয় কোনো অপরাধী সংগঠনের এত বড় আকারের অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা নেই।
বরং তদন্তে ইঙ্গিত মিলেছে, মরক্কোর ভূখণ্ড থেকেই পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ করে দেওয়া হয়েছিল। সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালনকারী মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনীর একাংশের ‘নিষ্ক্রিয়তা’ বা অভিবাসীদের অগ্রযাত্রায় বাধা না দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এখানেই তদন্তের সবচেয়ে বড় বাধা- মরক্কো।
স্পেনের আদালত চাইলে মরক্কোর সীমান্তরক্ষীদের শনাক্ত করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। একই সঙ্গে অভিবাসীদের ঢলের দিকে সংগঠিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ থাকা বেসামরিক ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য চাইতে পারে। কিন্তু এসব তথ্য পেতে হলে মরক্কোর সহযোগিতা প্রয়োজন।
স্পেনের সরকারি কৌঁসুলিরা আশা করছেন, রাবাত তদন্তে বাধা দেবে না। তবে কয়েকজন আইনজীবীর আশঙ্কা, মরক্কো এ ধরনের সহযোগিতায় রাজি নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তদন্তের এই অংশ কার্যত অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে ঘটনাটির সঙ্গে আরও গুরুতর অভিযোগ যুক্ত হয়েছে। মামলাটি সংগঠিত অপরাধের পাশাপাশি রাষ্ট্রের শান্তি বা স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অপরাধের একটি বিরল আইনি ধারার আওতায়ও এগোচ্ছে। স্পেনের ফৌজদারি আইনের এই ধারা খুব কম ব্যবহৃত হয়েছে এবং এ ধারায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার নজিরও নেই।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে উঠেছে মৃত্যুর সংখ্যা।
স্পেনের জলসীমা থেকে এখন পর্যন্ত ৮৩ জনের মরদেহ উদ্ধারের কথা উল্লেখ করে বিচারক বিদেশি নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃত হত্যার সম্ভাবনাও তদন্তের আওতায় এনেছেন।
ফলে সেউতার এই ঘটনা এখন কেবল একটি সীমান্ত বা অভিবাসন সংকটের তদন্তে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে তদন্তকারীরা খুঁজছেন, মরক্কোর ভূখণ্ড থেকে এত বড় একটি প্রবেশ কীভাবে সম্ভব হলো। অন্যদিকে স্পেনের হাতে থাকা আগাম সতর্কবার্তা কেন এবং কীভাবে কার্যকর হলো না- সেটিও সামনে আসছে।
তদন্ত যত এগোবে, সেউতার সেই রাতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো আরও স্পষ্ট হবে- এটি কি শুধু সীমান্তে হঠাৎ তৈরি হওয়া অভিবাসী ঢল ছিল, নাকি আগে থেকেই জানা একটি সংকটকে যথাসময়ে ঠেকানো সম্ভব ছিল?