বাংলাদেশে শিশু দত্তক নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ধরনের বিভ্রান্তি রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ইচ্ছা করলেই কোনো শিশুকে দত্তক নিয়ে নিজের সন্তান হিসেবে পরিচয় দেওয়া যায়। বাস্তবে বাংলাদেশের আইন ও ধর্মভিত্তিক ব্যক্তিগত আইনে বিষয়টি বেশ জটিল। বিশেষ করে মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রচলিত অর্থে দত্তক নেওয়ার আইনি সুযোগ নেই; আদালতের মাধ্যমে শিশুর অভিভাবকত্ব নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সন্তান না হওয়া দম্পতিদের কেউ কেউ পরিচিতজনের মাধ্যমে বা সরাসরি শিশুর জৈবিক বাবা-মায়ের সঙ্গে চুক্তি করে শিশুকে নিজেদের কাছে নিয়ে আসেন। কিন্তু স্ট্যাম্প পেপারে চুক্তি করে কোনো শিশুকে নিজের সন্তান হিসেবে নেওয়া আইনসম্মত পদ্ধতি নয়। শিশুর জৈবিক বাবা-মা ভবিষ্যতে কোনো দাবি করবেন না—এমন লিখিত চুক্তিও শিশুর ওপর তাদের আইনগত অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে না।
বাংলাদেশে মুসলিম আইনে দত্তক গ্রহণের ধারণা স্বীকৃত না থাকায় আদালতের মাধ্যমে মূলত শিশুর অভিভাবকত্ব নেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে আদালত শিশুটির নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ এবং সর্বোচ্চ কল্যাণকে গুরুত্ব দেয়। ১৮৯০ সালের গার্ডিয়ানস অ্যান্ড ওয়ার্ডস আইনের আওতায় এ ধরনের অভিভাবকত্বের আবেদন করা যায়। শিশুর বিষয়ে কোনো বিরোধ না থাকলে প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। তবে বিরোধ বা আপিলের মতো বিষয় থাকলে মামলা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
অভিভাবকত্ব পাওয়া আর সন্তান দত্তক নেওয়া এক বিষয় নয়। অভিভাবকত্বের মাধ্যমে একজন ব্যক্তি শিশুটিকে নিজের জিম্মায় নিয়ে তার দেখাশোনা, শিক্ষা ও লালন-পালনের দায়িত্ব নিতে পারেন। কিন্তু এতে শিশুটি আইনগতভাবে তার জৈবিক সন্তানের সমান হয়ে যায় না। বিশেষ করে মুসলিম ও খ্রিস্টান আইনে পালক সন্তান স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তরাধিকারীও হয় না।
হিন্দু ধর্মে দত্তকের সুযোগ
হিন্দু ব্যক্তিগত আইনে দত্তক গ্রহণের বিধান রয়েছে। তবে বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রেও কিছু নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা আছে। প্রচলিত আইনি কাঠামো অনুযায়ী বর্তমানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হিন্দু পুরুষের দত্তক নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নারীর ক্ষেত্রে নিয়ম আরও সীমিত—বিবাহিত নারীকে স্বামীর সম্মতি এবং বিধবা নারীকে স্বামীর জীবদ্দশায় দেওয়া অনুমতির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হয়।
অন্যদিকে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও মুসলিমদের মতো শিশুর অভিভাবকত্ব নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, প্রচলিত অর্থে দত্তক গ্রহণের আলাদা বিধান নেই।
বাংলাদেশে দত্তক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার পেছনে ধর্মীয় ও আইনি ইতিহাসও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৮৯ সালের শিশু অধিকার সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করলেও আন্তর্দেশীয় দত্তক সংক্রান্ত নির্দিষ্ট বিধানের ক্ষেত্রে পূর্ণ অনুমোদন দেয়নি। এর সঙ্গে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে দত্তক গ্রহণের স্বীকৃতি না থাকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে আইনজীবীরা মনে করেন।
১৯৭২ সালে যুদ্ধশিশু ও পরিত্যক্ত শিশুদের পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ওই ব্যবস্থার অধীনে শিশু দত্তকের সুযোগ ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে শিশু পাচার, অনিয়ম ও ধর্মান্তরের আশঙ্কাসহ বিভিন্ন অভিযোগ সামনে আসায় ১৯৮২ সালে আইনে পরিবর্তন আনা হয় এবং বিদেশিদের কাছে শিশু দত্তকের সুযোগ বন্ধ করা হয়।
তবে বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও আদালতের অনুমতি নিয়ে তারা বাংলাদেশে কোনো শিশুর অভিভাবকত্ব পেতে পারেন এবং নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিশুকে বিদেশেও নিতে পারেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পালক বা অভিভাবকত্ব পাওয়া শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। মুসলিম আইনে তাকে সম্পত্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে হেবা বা ওসিয়তের মতো আলাদা আইনি ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হয়। ওসিয়তের মাধ্যমে সাধারণভাবে মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিভেদে আলাদা আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ফলে বাংলাদেশে সন্তানহীন কোনো দম্পতি যদি একটি শিশুকে নিজের কাছে নিয়ে লালন-পালন করতে চান, তাহলে শুধু জৈবিক বাবা-মায়ের সঙ্গে চুক্তি করে বা স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করিয়ে শিশুকে নিয়ে আসা নিরাপদ আইনি পথ নয়। শিশুর ভবিষ্যৎ, পরিচয়, উত্তরাধিকার এবং অভিভাবকের অধিকার—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আদালতের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অভিভাবকত্ব নেওয়াই আইনসম্মত ও নিরাপদ পথ।