যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাড়তি শুল্কের চাপ সামলাতে গিয়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের অনেক ক্ষেত্রেই পণ্যের দাম কমাতে হয়েছে। এর ফলে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে দেশটিতে রপ্তানি করা বাংলাদেশি পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ২৬ শতাংশ কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানির তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ওটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র তুলে ধরেছে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস।
তথ্য বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ থেকে পোশাক রপ্তানির মোট মূল্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ রপ্তানির পরিমাণ যে হারে কমেছে, তার চেয়ে বেশি হারে কমেছে রপ্তানি মূল্য।
রপ্তানিকারকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপ করা অতিরিক্ত শুল্কের চাপ এর অন্যতম কারণ। বাড়তি শুল্কের একটি অংশ রপ্তানিকারকদের বহন করতে হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের ধরে রাখতে পোশাকের দাম কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত শুল্কের একটি অংশ বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের ওপর পড়েছে। এ কারণে কিছু ক্ষেত্রে পোশাকের দাম কমিয়ে দিতে হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে গড় ইউনিট মূল্যে।
রপ্তানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পোশাকে সাধারণ শুল্কহার ছিল ১৫ শতাংশের বেশি। এর সঙ্গে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে তা বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত অতিরিক্ত শুল্ক বাতিল করলেও ট্রাম্প প্রশাসন ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল রাখে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশি পোশাকের ওপর ২০ শতাংশ এবং এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ১০ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর ছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, অতিরিক্ত শুল্কের পুরো চাপ ক্রেতাদের ওপর দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি সামাল দিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্কের এক-তৃতীয়াংশ এবং কোথাও প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত রপ্তানিকারকদের বহন করতে হয়েছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্যের দাম কমিয়ে ক্রয়াদেশ ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, উৎপাদন ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও পোশাকের দাম বাড়েনি, বরং অনেক ক্ষেত্রে কমেছে। ব্যাবসা টিকিয়ে রাখতে কিছু উদ্যোক্তাকে লোকসানেও ক্রয়াদেশ নিতে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন চালাতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তিন থেকে চার গুণ বেশি দামে ডিজেল কিনে কারখানা চালাতে হচ্ছে। এর মধ্যে বিদেশি ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দাম প্রস্তাব করায় উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
তার মতে, দীর্ঘদিন এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে আরও কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইতোমধ্যে বাড়তি ব্যয় ও কম দামের কারণে অনেক কারখানা আর্থিক সংকটে পড়েছে।
তবে রপ্তানিকারকদের মধ্যে এখন কিছুটা আশাবাদও তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, অতিরিক্ত শুল্কের চাপ ভাগাভাগি করার বিষয়ে মার্কিন ক্রেতাদের আগের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশি পোশাকের জন্য তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।
শোভন ইসলাম বলেন, মার্কিন ক্রেতারা এখন আগের মতো ছাড় দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন না। এতে সামনে পোশাকের দাম কিছুটা ভালো পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ক্রয়াদেশও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।