ফ্রান্সজুড়ে বুধবার ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, আবর্জনার ডাস্টবিনে আগুন ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে প্রতিবাদকারীরা “সবকিছু বন্ধ করে দাও” কর্মসূচি পালন করেন। এর লক্ষ্য ছিল প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, তার রাজনৈতিক প্রশাসন এবং প্রস্তাবিত ব্যয় সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান জানানো।
সরকার জানায়, দেশজুড়ে মোতায়েন করা প্রায় ৮০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী দ্রুতই বাধা সরিয়ে ফেলায় ফ্রান্স পুরোপুরি অচল হয়নি। তবুও সংঘর্ষ ও অবরোধের ঘটনায় প্রায় ৩০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতেই দায়িত্ব নিলেন ফ্রান্সের নতুন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু। ম্যাক্রোঁর ঘনিষ্ঠ এই সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে। তিনি ম্যাক্রোঁর দ্বিতীয় মেয়াদে পঞ্চম এবং ২০১৭ সাল থেকে সপ্তম প্রধানমন্ত্রী।
বিক্ষোভের চিত্র
রাজধানী প্যারিসের বিভিন্ন এলাকায় আবর্জনার ডাস্টবিন ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়, স্কুল ও সড়ক অবরোধ করা হয়, এমনকি পুলিশের দিকে আবর্জনা নিক্ষেপ করা হয়। লিয়ঁ শহরে সড়ক অবরোধ ও ডাস্টবিনে আগুন দেওয়া হয়, নঁতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, আর মন্তপেলিয়েতে ব্যবহার করা হয় পানি কামান। মার্সেই শহরে পুলিশ প্রায় ২০০ বিক্ষোভকারীকে প্রধান সড়ক অবরোধ থেকে বিরত রাখে।

একজন শিক্ষার্থী জানান, “কর্মজীবী শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর থেকে ভালো সমাধান থাকতে পারত।” অপরদিকে এক শ্রমিক নেতা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, অনলাইনে যত বিপ্লবী দেখা যায়, বাস্তবে তত মানুষ মাঠে নামে না।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রেতাইয়ো সতর্ক করে বলেছেন, সহিংসতার ক্ষেত্রে কোনো সহনশীলতা দেখানো হবে না।
রাজনৈতিক অচলাবস্থা
লেকর্নুর প্রথম কাজ হবে ২০২৬ সালের বাজেট সংসদে পাস করানো। দেশটির ঘাটতি জিডিপির ৫.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যা কমাতে সব দলের ঐকমত্য থাকলেও কর বৃদ্ধি ও ব্যয় সংকোচন নিয়ে মতভেদ প্রবল। লেকর্নুকে অক্টোবর ৭ তারিখের মধ্যে বাজেটের খসড়া সংসদে উপস্থাপন করতে হবে, যা সর্বোচ্চ অক্টোবর ১৩ পর্যন্ত স্থগিত রাখা সম্ভব।

কিন্তু তার সামনে রাজনৈতিক সমীকরণ জটিল। বামপন্থী ফ্রান্স আনবাউড (এলএফআই) ইতিমধ্যেই অনাস্থা প্রস্তাবের ঘোষণা দিয়েছে। ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি (আরএন) শর্তসাপেক্ষে সহযোগিতা করতে পারে বলে জানিয়েছে। আরএন বর্তমানে সংসদের সবচেয়ে বড় দল এবং অনাস্থা ভোটে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দল ধনীদের ওপর কর আরোপসহ বাজেট সংস্কারের দাবি তুলেছে। রিপাবলিকানরা আবার যে কোনো ধরনের করবৃদ্ধির বিরোধী। ফলে লেকর্নুর জন্য সবার সঙ্গে সমঝোতা করা কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি
দায়িত্ব গ্রহণের পর লেকর্নু প্রতিশ্রুতি দেন, সরকার “রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় ঐক্য” রক্ষায় কাজ করবে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজনে বড় ধরনের পরিবর্তন বা “রাপচার” ঘটানো হবে।
ফ্রান্সে ২০১৮ সালের “ইয়েলো ভেস্ট” আন্দোলনের মতোই এবারকার বিক্ষোভও নেতৃত্বহীন ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। তবে এটিই লেকর্নুর জন্য প্রথম পরীক্ষার মঞ্চ—যেখানে জনরোষ ও রাজনৈতিক জটিলতার মধ্যে দিয়ে তাকে বাজেট এবং স্থিতিশীলতা দুটোই সামলাতে হবে।