কাঠমান্ডু: নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ বন্যার পর ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে যখন মরিয়া উদ্ধার অভিযান চলছে, তখনই নতুন বিপদের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নদীর গতিপথে ধ্বংসাবশেষ জমে সৃষ্ট একটি বিশাল ‘ব্যারেজ লেক’-এর পানি দ্রুত বাড়ছে। সেটি ভেঙে গেলে আবারও ভয়াবহ ঢল নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেছে নেপাল ও চীন। এরই মধ্যে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৩৯২-এ পৌঁছেছে এবং প্রায় ১ হাজার ৪৬৮ জন এখনও নিখোঁজ বা যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন।
নেপালের সর্বশেষ সরকারি হিসাবে দেশটিতে ৩৮৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে এবং ৯১০ জন নিখোঁজ বা যোগাযোগবিচ্ছিন্ন রয়েছেন। চীনের তিব্বত অঞ্চলে আরও তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়েছে এবং সেখানে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ও সড়ক অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধারকাজে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক ও সেতু। বন্যার প্রবল স্রোতে বহু সেতু, রাস্তা, বসতি ও অবকাঠামো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় স্থলপথে দুর্গত এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে নেপালি সেনাবাহিনী ও উদ্ধারকারী দলগুলো হেলিকপ্টারের সাহায্যে দুর্গম এলাকায় পৌঁছাচ্ছে এবং আটকে পড়াদের সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি জরুরি খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।
নতুন করে বন্যার আশঙ্কাই এখন উদ্ধার অভিযানের গতিপথও বদলে দিচ্ছে। নেপাল-চীন সীমান্তের দুই পাশে ধ্বংসাবশেষে নদীর পানি আটকে নতুন জলাধার তৈরি হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের তিব্বত অংশে তৈরি একটি হ্রদে আগামী কয়েক দিনে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি জমতে পারে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে সেটি উপচে বা প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তাই বাসিন্দা, পর্যটক ও উদ্ধারকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে।
এদিকে নিখোঁজদের বড় একটি অংশ বিদেশি নাগরিক হওয়ায় দুর্যোগটি নেপালের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। নেপালের পর্যটন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজদের মধ্যে শত শত বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবরের পথে থাকা ভারতীয় তীর্থযাত্রীদের একটি বড় অংশ এখনও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে অন্তত ২৮৮ ভারতীয় নাগরিক এখনও যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন।
তবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে নিখোঁজের তালিকাটিও স্থির নয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রীদের অনেকের সঙ্গে ধীরে ধীরে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। যেমন অন্ধ্রপ্রদেশের ৪১ জনের মধ্যে ৩৪ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে, অন্যদিকে মহারাষ্ট্রের ১১৪ জনের মধ্যে ৬১ জন এখনও যোগাযোগের বাইরে রয়েছেন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এসব সংখ্যা দেখাচ্ছে, যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার হলে নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা দ্রুত বদলে যেতে পারে।
নেপালের এই দুর্যোগের আন্তর্জাতিক মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায়। ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে নেপালের জন্য ৫ লাখ ডলারের জরুরি সহায়তা ঘোষণা করেছে এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, নেপালের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, এখন প্রশ্ন শুধু কত মানুষ মারা গেল বা কতজন নিখোঁজ—তা নয়; প্রশ্ন হচ্ছে, হিমালয়ের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল ভূপ্রকৃতিতে এমন দুর্যোগের পরপরই দ্বিতীয় বিপর্যয় ঠেকানোর মতো প্রস্তুতি নেপাল ও চীনের আছে কি না। বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, লাংটাং লিরুং এলাকার হিমবাহের নিচের শিলাস্তর ধসে বরফ ও বিপুল পরিমাণ পাথর নিচে নেমে আসে এবং এর ফলে সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষের স্রোত নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে বিপর্যস্ত করে।
জলবায়ু পরিবর্তনও আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, নির্দিষ্ট এই ধসের সরাসরি কারণ হিসেবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে এখনই চূড়ান্তভাবে দায়ী করা যাচ্ছে না। তবে হিমবাহ গলে যাওয়া, পারমাফ্রস্ট দুর্বল হওয়া এবং উচ্চ হিমালয়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার প্রবণতা উষ্ণ পৃথিবীতে বাড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, নেপালের এবারের সংকট এখন আর একটি ‘বন্যার পর উদ্ধার অভিযান’-এ সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজদের সন্ধান, অন্যদিকে নতুন ব্যারেজ লেক ভেঙে দ্বিতীয় দফার বন্যার আশঙ্কা—দুই সংকট একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে নেপাল ও চীনকে। আর শত শত বিদেশি নাগরিকের নিখোঁজ থাকার কারণে আগামী কয়েক দিন এই উদ্ধার অভিযান শুধু নেপালের জন্য নয়, ভারতসহ বহু দেশের জন্যও বড় উদ্বেগের কেন্দ্র হয়ে থাকবে।