মালয়েশিয়ায় আইনি জটিলতা, শ্রম বিরোধ ও অভিবাসনসংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় পড়া বাংলাদেশি প্রবাসীদের সহায়তায় চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। ট্রাভেল পাস ইস্যু, আইনি ও কনস্যুলার সহায়তা, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও ক্ষতিপূরণ আদায় এবং মৃত প্রবাসীদের মরদেহ দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে মিশনটি।
হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ৬ হাজার ৮৫৩টি ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক ১ হাজার ৩১৯ জন বাংলাদেশিকে ট্রাভেল পাস দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথির অভাবে দেশে ফিরতে না পারা প্রবাসীদের জন্য এ সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
হাইকমিশন সূত্র জানায়, অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক বাংলাদেশিদের পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং দ্রুত ট্রাভেল পাস ইস্যুর মাধ্যমে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ও জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি হাইকমিশনের কর্মকর্তারা নিয়মিত ৮টি কারাগার ও ১৩টি ডিটেনশন ক্যাম্প পরিদর্শন করে আটক বাংলাদেশিদের প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও মানবিক সহায়তা প্রদান করছেন।
মানবিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সরকারি খরচে ১৩ জন বাংলাদেশির মরদেহ দেশে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া নিয়োগকর্তা, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও স্বজনদের অর্থায়নে আরও ৫৮৪ জনের মরদেহ দেশে পাঠাতে প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। মরদেহ দেশে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়ায় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দিয়ে আসছেন।
একই সময়ে শ্রম বিরোধ, বকেয়া বেতন, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, অভিবাসন আইনসংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য সমস্যায় থাকা প্রায় ৪০০ জন বাংলাদেশি প্রবাসীকে কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
হাইকমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভিসাসংক্রান্ত জটিলতার নিষ্পত্তি, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু এবং অন্যান্য দাবির বিপরীতে ৪ লাখ ৯২ হাজার ৬৬৭ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত ক্ষতিপূরণ (কনডোলেন্স মানি) আদায় করা হয়েছে। এছাড়া বৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ও স্থায়ী অক্ষমতার ঘটনায় মালয়েশিয়ার সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা সকসো (SOCSO) থেকে ৫৮ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮ রিঙ্গিত ক্ষতিপূরণ আদায় করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য ৬৩ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮ রিঙ্গিত ক্ষতিপূরণ ও আর্থিক সুবিধা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ হাইকমিশন। সংশ্লিষ্টদের মতে, মালয়েশিয়ার সরকারি সংস্থা, নিয়োগকর্তা ও আইনজীবীদের সঙ্গে সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, “প্রবাসীদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বাংলাদেশ হাইকমিশনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বিপদে পড়া প্রত্যেক বাংলাদেশিকে দ্রুত কনস্যুলার সেবা, আইনি সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন।”
হাইকমিশনের মিনিস্টার (শ্রম) সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “মান্যবর হাইকমিশনারের নির্দেশনায় শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমরা মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। বকেয়া বেতন, ক্ষতিপূরণ এবং অন্যান্য দাবির দ্রুত নিষ্পত্তিতে শ্রম উইং সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে সকসোসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে আমরা নিয়মিত তদারকি করছি।”
প্রবাসী কমিউনিটির নেতারা মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ায় অভিবাসন আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ফলে অনেক বাংলাদেশি বিভিন্ন আইনি জটিলতায় পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কনস্যুলার ও শ্রম উইংয়ের কার্যক্রম আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাদের মতে, প্রবাসীদের কল্যাণে বিদ্যমান সেবার পাশাপাশি আইনি সহায়তা আরও সম্প্রসারণ এবং শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ট্রাভেল পাস প্রদান, আইনি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ আদায় এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর মতো কার্যক্রম শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রতিফলন। প্রবাসীদের সুরক্ষা ও কল্যাণে এসব উদ্যোগ আরও শক্তিশালী ও গতিশীল হলে মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা আরও বেশি উপকৃত হবেন।