কূটনৈতিক দায়িত্ব কেবল পাসপোর্ট বিতরণ বা কনস্যুলার সেবা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকে প্রবাসী নাগরিকদের আস্থা, রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে, যখন স্পেনের বিশেষ নিয়মিতকরণ কর্মসূচি হাজারো বাংলাদেশির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছিল, তখন বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব ছিল প্রত্যক্ষ এবং সুদূরপ্রসারী।
এই প্রেক্ষাপটে দূতাবাসের সাম্প্রতিক প্রতিবাদমূলক বিবৃতি নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দূতাবাসের সমন্বয়হীনতার কারণে কেউ কেউ ৩০ জুন ২০২৬-এর আগে বিশেষ নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়ায় আবেদন করতে পারেননি—এমন দাবি “মিথ্যা”, “বিভ্রান্তিকর” ও “গর্হিত”। আরও দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, পুলিশ প্রশাসন এবং এটুআই-এর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে সময়মতো সব ধরনের সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে।
কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। ৫ জুলাই প্রকাশিত প্রবাহ বাংলা–এর সংবাদের (https://probahobangla.com/news/20131) কোথায় বলা হয়েছে যে কেউ কেউ ৩০ জুনের আগে আবেদনই করতে পারেননি?
এমন কোনো দাবি উক্ত সংবাদে ছিল না। আমরা লিখেছিলাম, প্রশাসনিক বিলম্ব, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সংগ্রহে জটিলতা এবং বিশেষ সহায়ক দল সময়মতো স্পেনে না পৌঁছানোর কারণে অনেক আবেদনকারী নিয়মিতকরণ প্রক্রিয়ার শুরুর দিকেই প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে পারেননি। ফলে স্পেন সরকারের ঘোষিত প্রাথমিক আবেদনকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই দুই বক্তব্য এক নয়। একটি পুরো আবেদনকালজুড়ে আবেদন করতে না পারার প্রশ্ন, অন্যটি আবেদন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুরুর পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিতে বিলম্ব হওয়ার বিষয়। তাই আমাদের উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব না দিয়ে এমন একটি বক্তব্যের প্রতিবাদ করা হয়েছে, যা আমাদের প্রতিবেদনে ছিলই না। প্রশ্ন হলো, এটি কি প্রকৃত অভিযোগের জবাব, নাকি মূল বিতর্ক থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা?

তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন রয়ে গেছে—সরকারি নথিতে প্রতিফলিত সিদ্ধান্ত ও ঘটনাপ্রবাহের ব্যাখ্যা কী?
প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তি ছিল সরকারি নথি, সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের বক্তব্য। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও কনস্যুলার সেবা জোরদারে একটি বিশেষ সহায়ক দল স্পেনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। অথচ ২০২৬ সালের ১২ মার্চ রাষ্ট্রদূত স্বাক্ষরিত একটি সরকারি চিঠিতে সেই উদ্যোগ পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করা হয়।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি শুরু থেকেই সবকিছু এতটাই সফল, সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত হয়ে থাকে, তাহলে সরকারের নেওয়া সেই বিশেষ উদ্যোগ পুনর্বিবেচনার সুপারিশ কেন করা হয়েছিল?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, যে সহায়ক দলকে প্রথমে প্রয়োজনীয় মনে করা হয়নি, শেষ পর্যন্ত সেই দলই কেন মে মাসে স্পেনে এসে কাজ শুরু করল? প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কি পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়েছিল, নাকি বাস্তব পরিস্থিতিই প্রথম সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন তৈরি করেছিল?
দূতাবাস বলছে, অনলাইন পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও ই-অ্যাপোস্টিল ব্যবস্থার মাধ্যমে সবাই সময়মতো সেবা পেয়েছেন। যদি সেটিই বাস্তবতা হয়, তাহলে শুরুতে হাজারো আবেদনকারী কেন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন? কেন অফলাইন প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছিল? কেন বিভিন্ন শহরে অথোরাইজেশন ফর্ম সত্যায়নের জন্য ২০ ইউরো ফি নেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল? আর কেন প্রবাসীরা ধারাবাহিকভাবে অতিরিক্ত জনবল ও বিশেষ সেবা দলের দাবি জানিয়েছিলেন?
আরও একটি বক্তব্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দূতাবাস বলেছে, ২৫ মে-র পর নিয়মিতকরণসংক্রান্ত সেবা নিতে তেমন কেউ আর আসেননি। কিন্তু এই তথ্য কি আদৌ প্রমাণ করে যে শুরু থেকেই কোনো প্রশাসনিক সংকট ছিল না?
বরং এর ভিন্ন ব্যাখ্যাও হতে পারে। আবেদন প্রক্রিয়ার সবচেয়ে সংকটপূর্ণ সময় ছিল জানুয়ারি থেকে মে মাসের মাঝামাঝি। অধিকাংশ আবেদনকারী এই সময়েই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহে হিমশিম খেয়েছেন। ফলে মে মাসের শেষ দিকে চাপ কমে যাওয়া পূর্ববর্তী কয়েক মাসের পরিস্থিতিকে অস্বীকার করার যথেষ্ট ভিত্তি হতে পারে না।
দূতাবাসের বিবৃতিতে আমাদের প্রতিবেদনে উত্থাপিত তথ্যভিত্তিক প্রশ্নগুলোর কোনো নির্দিষ্ট জবাব নেই। সেখানে ১২ মার্চের সরকারি চিঠির ব্যাখ্যা নেই, বিশেষ সহায়ক দল বিলম্বে পাঠানোর কারণ নেই, কতজন আবেদনকারী প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাননি—সে সম্পর্কেও কোনো পরিসংখ্যান নেই। সেবা প্রদানে বিলম্ব নিয়ে স্বাধীন কোনো মূল্যায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়নি। বরং মূল প্রশ্নগুলোর উত্তর না দিয়ে পুরো প্রতিবেদনকে “মিথ্যা” বলে অভিহিত করা হয়েছে।
কিন্তু কোনো সংবাদকে “মিথ্যা” বললেই কি সরকারি নথির অস্তিত্ব বা সেখানে উল্লিখিত তথ্যের প্রশ্নগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়?
সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি হলো, যে তথ্য নথি দ্বারা সমর্থিত, তার জবাবও নথি দিয়েই দিতে হয়। আবেগ দিয়ে নয়, প্রশাসনিক ভাষণ দিয়ে নয়, কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতি দিয়েও নয়।
আরও একটি বিষয় উপেক্ষা করা যায় না। সংবাদ প্রকাশের আগে রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল। তখন কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। প্রশ্ন হলো, সংবাদ প্রকাশের আগে নীরব থেকে পরে পুরো প্রতিবেদন অস্বীকার করা কি জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
প্রবাসীরা আজ একটি বিষয়ই জানতে চান—কোনো সিদ্ধান্ত, কোনো বিলম্ব বা কোনো প্রশাসনিক অবস্থানের কারণে যদি একজন আবেদনকারীও বৈধ হওয়ার সুযোগ হারিয়ে থাকেন, তাহলে সেই দায় কার?
রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। একজন রাষ্ট্রদূতও নন। আবার কোনো অভিযোগও প্রমাণ ছাড়া সত্য হয়ে যায় না। তাই এই বিতর্কের একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক তদন্ত।
কারণ এই প্রশ্ন একজন রাষ্ট্রদূতের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির নয়; এটি হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশির অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহি এবং সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার প্রশ্ন।
প্রতিবাদমূলক বিবৃতি প্রকাশ করা সহজ। কিন্তু নথির সঙ্গে নথি মিলিয়ে প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দেওয়াই প্রকৃত জবাবদিহি। সত্যের শক্তি বিবৃতিতে নয়, প্রমাণে।
▪️আফাজ জনি লেখক ও সাংবাদিক
ইমেইল- [email protected]