যখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন ফুটবলবিশ্বে শুরু হয়েছিল তুমুল বিতর্ক। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, অতিরিক্ত দলের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতার মান কমে যাবে, গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো হবে একপেশে এবং রোমাঞ্চ হারাবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর।
কিন্তু মাঠের খেলা যেন সেই সব আশঙ্কাকে একে একে ভুল প্রমাণ করে দিচ্ছে। টুর্নামেন্টের প্রথম দিকের ম্যাচগুলোতেই দেখা গেছে, তথাকথিত ছোট দলগুলো বড় শক্তিগুলোর বিপক্ষে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলছে। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপ এখন পর্যন্ত ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এক বিস্ময়কর সফল আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্ডারডগদের চোখ রাঙানি
বিশ্বকাপের শুরু থেকেই দেখা গেছে, র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে থাকা দলগুলো কেবল অংশগ্রহণ করতেই আসেনি, বরং বড় দলগুলোর বিপক্ষে সমানতালে লড়াই করছে। আর্জেন্টিনা, স্পেন, বেলজিয়াম কিংবা উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলগুলোও সহজ জয় পায়নি।
বিশেষ করে কেপ ভার্দে ইতিহাসের অন্যতম বড় চমক উপহার দিয়েছে। ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত দল হয়ে উঠেছে আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্রটি।
ম্যাচজুড়ে কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহার অসাধারণ নৈপুণ্য স্পেনের তারকা আক্রমণভাগকে হতাশ করে। ম্যাচ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতারাতি জনপ্রিয়তায় বিস্ফোরণ ঘটে তার।
ড্র-ই এখন বড় অঘটন
২০২৬ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে ড্র হওয়া ম্যাচগুলো থেকে। ছোট দলগুলো শুধু রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলেই নয়, বরং আক্রমণাত্মক ফুটবলের মাধ্যমেও বড় দলগুলোকে চাপে ফেলছে।
মিশর শক্তিশালী বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-১ গোলের ড্র করে মূল্যবান এক পয়েন্ট অর্জন করেছে। একইভাবে সৌদি আরব উরুগুয়ের বিপক্ষে লড়াই করে ড্র আদায় করে নেয়।
অন্যদিকে ইরান ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যকার ২-২ গোলের রোমাঞ্চকর ম্যাচটি প্রমাণ করেছে যে আধুনিক ফুটবলে দলগুলোর মধ্যকার ব্যবধান আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে।
নাটকীয় জয় ঘানার
গ্রুপ ‘এল’-এ ঘানা ও পানামার ম্যাচটি ছিল টুর্নামেন্টের অন্যতম নাটকীয় লড়াই। পুরো ম্যাচে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা পানামা শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে হার মানে।
ম্যাচের ৯৫তম মিনিটে তরুণ ফুটবলার ক্যালেব ইরেনকির গোলে ১-০ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ঘানা। চলতি বিশ্বকাপে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দেরিতে হওয়া জয়সূচক গোল।
স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের দাপুটে শুরু
বিশ্বকাপের আগে প্রস্তুতি ম্যাচে হতাশাজনক ফলের কারণে সমালোচনার মুখে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে মূল আসরে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই তারা সব জবাব দিয়েছে মাঠে।
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ৪-১ গোলের বড় জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে স্বাগতিকরা। ফোলারিন বালোগান ও জিও রেইনার পারফরম্যান্স নতুন করে ফুটবল উন্মাদনা সৃষ্টি করেছে মার্কিন সমর্থকদের মধ্যে।
ফুটবলের সঙ্গে সংস্কৃতির মিলনমেলা
শুধু মাঠের খেলাই নয়, ২০২৬ বিশ্বকাপের আরেকটি বড় আকর্ষণ হয়ে উঠেছে তিন স্বাগতিক দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।
মেক্সিকোর মারিয়াচি সুর, যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক স্টেডিয়াম সংস্কৃতি এবং কানাডার সুশৃঙ্খল আয়োজন বিশ্বকাপকে রূপ দিয়েছে এক বৈশ্বিক উৎসবে। ফুটবলের পাশাপাশি ফ্যাশন, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে তরুণ প্রজন্মের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাচ্ছে এই আসর।
সংশয় থেকে সাফল্যের গল্প
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে, ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাট নিয়ে যে নেতিবাচক আলোচনা ছিল, মাঠের ফুটবল তা অনেকাংশেই ভুল প্রমাণ করেছে।
অপ্রত্যাশিত ফল, আন্ডারডগদের সাহসী লড়াই, নাটকীয় মুহূর্ত এবং প্রতিটি ম্যাচে অনিশ্চয়তার উপস্থিতি ২০২৬ বিশ্বকাপকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। নকআউট পর্ব শুরু হলে এই রোমাঞ্চ আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
ফুটবল বিশ্বের অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, অনিশ্চিত এবং বৈচিত্র্যময় আসরগুলোর একটি হয়ে উঠতে যাচ্ছে—যেখানে কোনো দলই খুব বড় নয়, আবার কোনো দলই খুব ছোট নয়।