প্রাচীন সভ্যতার দেশ মিশরে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি শিশু-কিশোরদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাখতে গড়ে উঠেছে ‘ভার্চুয়াল বাংলা স্কুল ইন ইজিপ্ট’। সম্প্রতি এই স্কুলের উদ্যোগে কায়রোতে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি বর্ণাঢ্য ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান। গত শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে দেশটির রাজধানী কায়রোর ঐতিহাসিক আল-আজহার উদ্যানে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। স্কুলটির শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে পুরো উদ্যান যেন পরিণত হয়েছিল এক টুকরো বাংলাদেশে।
মাত্র ৩ জন থেকে ১৯ জন শিক্ষার্থীর যাত্রা-অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থিত অতিথিদের স্বাগত জানান সঞ্চালক পুষ্পিতা চৌধুরী। তিনি বলেন, “ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির পাশাপাশি বাংলা স্কুল পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক পরিচয় ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধিই এ আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। এরপর সহ-সঞ্চালক আসমা রহমান স্কুলটির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মাত্র তিনজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা ‘ভার্চুয়াল বাংলা স্কুল’ বর্তমানে তিনটি গ্রুপে মোট ১৯ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শুধু মিশর নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও প্রবাসীদের সন্তানরা অনলাইনে এই বাংলা ক্লাসে অংশ নিচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের পক্ষে রনি বণিক নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বলেন, প্রবাসে বেড়ে ওঠা শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষায় এই উদ্যোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।শিশুদের কলকাকলিতে মুখর সাংস্কৃতিক পর্ব- আলোচনা পর্ব শেষে শুরু হয় শিশুদের অংশগ্রহণে জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কবিতা আবৃত্তি, ছড়া, গান, নৃত্য ও নাট্য পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল। কবিতা ও গান: সুকুমার বড়ুয়ার ‘এমন যদি হতো’ কবিতা আবৃত্তি করে সাংস্কৃতিক পর্বের সূচনা করে শিশু রাইয়ান। এরপর ইয়ানুর, রামিজা ও রাফিদার চমৎকার আবৃত্তি এবং আব্দুর রহমানের ছড়া দর্শকদের মুগ্ধ করে। মুনতাসির পরিবেশন করে আধুনিক গান।
নৃত্য ও পুতুল নাচ: নুসাইবা ও আমায়রার পুতুল নাচ, রুদাইনার ছড়াগান এবং গল্পের নৃত্য পরিবেশনা উপস্থিত সবাইকে আনন্দ দেয়। সাহিত্যচর্চা ও নাটক: কাজী নজরুল ইসলাম, সুকুমার রায়, আল মাহমুদ ও নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের বিভিন্ন বিখ্যাত রচনাভিত্তিক পরিবেশনা শিশুদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের পরিচয় দেয়। এছাড়া, রাইয়ান ও মুনতাসিরের পরিবেশিত একটি রম্য নাটক অনুষ্ঠানস্থলে হাসির রোল তৈরি করে।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে শিক্ষিকা পুষ্পিতা চৌধুরীর একক সংগীত পরিবেশনা দর্শকরা বেশ উপভোগ করেন। ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও পুরস্কার বিতরণ –সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে আয়োজিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন বয়সভিত্তিক মজার খেলাধুলা। ছোটদের জন্য ‘মার্বেল দৌড়’, মাঝারি গ্রুপের জন্য ‘চকলেট দৌড়’ এবং বড়দের জন্য ছিল ‘স্মৃতিশক্তি পরীক্ষা’। খেলাগুলোতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদের উৎসাহ ও উদ্দীপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও ভবিষ্যৎ প্রত্যয়,অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে ‘ভার্চুয়াল বাংলা স্কুল ইন ইজিপ্ট’-এর উদ্যোক্তা উম্মে কুলসুম জামেনা সকল শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “সবার আন্তরিক সহযোগিতা ও ভালোবাসার কারণেই প্রবাসের মাটিতে এমন একটি সুন্দর আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বুকে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বীজ বুনে দেওয়ার এই অনন্য উদ্যোগটি অভিভাবক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। উপস্থিত সকলেই আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এমন আয়োজনের ধারা অব্যাহত থাকবে এবং নতুন প্রজন্মের সঙ্গে বাংলা সংস্কৃতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে।