মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম দেশের বড় বড় কোম্পানি ও কংগ্লোমারেটগুলোর প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিপুল মুনাফার আড়ালে যেন শ্রমিকদের কল্যাণ কোনোভাবেই অবহেলিত না হয়।
শুক্রবার (১ মে) জাতীয় পর্যায়ের শ্রমিক দিবস ২০২৬ উদযাপন অনুষ্ঠানে ১৫ হাজারেরও বেশি কর্মজীবী মানুষের উপস্থিতিতে তিনি এ বক্তব্য দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ন্যূনতম মজুরি ৩,০০০ রিঙ্গিত নির্ধারণের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, বড় কোম্পানিগুলো ন্যায্য মজুরি দিলেও লাভজনক অবস্থান ধরে রাখতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, শুরুতে সরকারি মালিকানাধীন কিছু কোম্পানিতে উদ্বেগ থাকলেও বাস্তবে তাদের ব্যবসা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তারা সন্তোষজনক মুনাফা অর্জন করেছে।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, আমি প্রতি বছর যে কথা বলি, আজ আবারও তা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই—নিয়োগকর্তারা, বিশেষ করে ধনী কোম্পানি ও বড় কংগ্লোমারেটগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনুন।
তিনি আরও বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত দেশ গড়তে হলে ধনীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ার শীর্ষ ৫০টি কোম্পানির মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন রিঙ্গিত মুনাফা করলেও কর্মীদের সামান্য বেতন বৃদ্ধিতেও অনীহা দেখায়, যা উদ্বেগজনক।
তিনি প্রশ্ন তোলেন,আমাদের দেশে এমন কোম্পানি আছে যারা ১ থেকে ২ বিলিয়ন রিঙ্গিত লাভ করে, কিন্তু কর্মীদের ৪০ রিঙ্গিত বেতন বাড়াতেও কষ্ট হয়—এটা কীভাবে সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, কম বেকারত্ব এবং শক্তিশালী রিঙ্গিত ইতিবাচক হলেও সাধারণ মানুষের জীবনমানও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, কারখানা শ্রমিক এবং নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীদের ত্যাগের কারণেই আজকের স্থিতিশীলতা এসেছে। তাই বেসরকারি খাতকেও ন্যায্য বণ্টনে দায়িত্বশীল হতে হবে।
আনোয়ার বলেন,আইনগতভাবে বড় পরিসরে বেতন বৃদ্ধি বাধ্যতামূলক করা কঠিন হলেও কোম্পানির মালিকদের বিবেক ও মানবিকতার জায়গা থেকে বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। তিনি আরও বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ সকল শ্রমিকের ন্যায্য মর্যাদা ও গুরুত্ব নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন, এই আহ্বান দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমানোর জন্য নয়। বরং এটি মানবিকতার দাবি, যা “মালয়েশিয়া মাদানি” ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি বলেন,আমি এমন কোনো প্রস্তাব দিচ্ছি না যা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমাবে। আমি শুধু চাই নেতৃত্ব আরও সহানুভূতিশীল ও মানবিক হোক।
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তা আগের চেয়ে অনেক জটিল হয়ে উঠেছে। সরকার এই চাপ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি জানান, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মে মাসে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও চ্যালেঞ্জিং হয়েছে।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ফেব্রুয়ারির শেষে ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলার ছিল, যা এখন বেড়ে ১১৫ ডলারে পৌঁছেছে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়ছে। তিনি আরও বলেন, কৃষি ও উৎপাদন খাতে এর প্রভাব স্পষ্ট। ফসফেটসহ কিছু কাঁচামালের ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ট্রাক চালক ও কারখানা শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাব বিশ্বব্যাপী অনুভূত হচ্ছে এবং কেউই এর বাইরে নয়। এদিকে জাতীয় শ্রমিক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে শ্রমিকদের কল্যাণ ও নিরাপত্তা জোরদারে একাধিক উদ্যোগ ঘোষণা করেছে মালয়েশিয়া সরকার। মানবসম্পদমন্ত্রী আর. রামানান জানান, আগামী জুন থেকে দেশের প্রায় ৯.৬ মিলিয়ন শ্রমিক ২৪ ঘণ্টা সামাজিক নিরাপত্তা সুরক্ষার আওতায় আসবেন। এটি বাস্তবায়ন করবে সামাজিক নিরাপত্তা সংস্থা (সকসো)।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কর্মস্থলের বাইরের দুর্ঘটনাও সুরক্ষার আওতায় আসবে। তিনি আরও জানান, গিগ অর্থনীতির ১.৬৪ মিলিয়ন কর্মী এখন “গিগ ওয়ার্কার্স বিল” এর আওতায় সুরক্ষিত, যা ৩১ মার্চ থেকে কার্যকর হয়েছে।
গৃহিণীদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রকল্পে বয়সসীমা ৫৫ থেকে বাড়িয়ে ৬০ বছর করা হয়েছে, যার ফলে আরও ৭ লাখ ২০ হাজারের বেশি নারী উপকৃত হবেন।
সরকার আরও জানিয়েছে, মোবাইল শ্রম আদালত চালুর পরিকল্পনা, “মাদানি এমপ্লয়ি কার্ড” গিগ কর্মীদের জন্য সম্প্রসারণ, ২৬টি শ্রম আইন সংস্কার, ২০৩০ সালের মধ্যে ন্যূনতম মজুরি ৩,০০০ রিঙ্গিত করার লক্ষ্য এআই-নির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা, সেমিকন্ডাক্টর একাডেমি স্থাপন।
মন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ শ্রমিকদের সুরক্ষা জোরদার করার পাশাপাশি ন্যায্য ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।