গ্রিস–ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন এখন অনেকের জন্য ভয়াবহ বাস্তবতা হয়ে উঠছে। দালালচক্রের প্রলোভনে পড়ে হাজারো বাংলাদেশি বিপজ্জনক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে জীবন হারাচ্ছেন বা নিঃস্ব হয়ে ফিরছেন।
সুনামগঞ্জের তরুণ শাকিল আহমেদের গল্প সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
উন্নত জীবনের আশায় ২০২৩ সালে এক দালালের মাধ্যমে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ করে দুবাই ও মিসর হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছালেও শেষ পর্যন্ত সেখানে দীর্ঘদিন অমানবিক পরিস্থিতিতে আটকা পড়েন। পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে কষ্টে দিন কাটানোর পর অবশেষে International Organization for Migration-এর সহায়তায় দেশে ফিরতে সক্ষম হন।
তার মতো অনেকেই দালালদের প্রতারণার শিকার হয়ে ঋণের বোঝা নিয়ে দেশে ফিরছেন। পরিবারের সদস্যরা ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করলেও সেই অর্থ আর ফেরত পাওয়া যাচ্ছে না।
United Nations High Commissioner for Refugees-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল সর্বাধিক। ওই বছর ২০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি এই পথে ইউরোপে প্রবেশ করেন, যা মোট অভিবাসীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
২০২৬ সালের শুরুতেও এই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। প্রথম দুই মাসেই এক হাজারের বেশি বাংলাদেশি একই বিপজ্জনক পথে ইউরোপে পৌঁছেছেন।
লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর অনেক বাংলাদেশিকে আটক করে রাখা, নির্যাতন করা এবং মুক্তিপণ দাবি করার ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। সাম্প্রতিক এক ঘটনায় জানা যায়, লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে।
BRAC-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে—
- ইউরোপে যাওয়ার প্রলোভনে পড়া অধিকাংশ মানুষ কাজ পান না
- অনেককে পথে আটক করা হয়
- বেশিরভাগই শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন
- অনেকেই দিনে এক বেলা খাবার নিয়েই বেঁচে থাকেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে যেখানে ইতালি ছিল প্রধান গন্তব্য, এখন অনেকেই লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে রুট পরিবর্তন হলেও ঝুঁকি কমেনি; বরং নতুন নতুন এলাকা থেকে পাচার বাড়ছে।
অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা এককভাবে কোনো দেশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এজন্য বহুপাক্ষিক উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সংস্থাগুলো জানাচ্ছে, যেসব এলাকা থেকে বেশি মানুষ এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাচ্ছেন, সেখানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। তবে অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা হওয়ায় প্রতিরোধে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপের স্বপ্ন এখন অনেকের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। নিরাপদ ও বৈধ পথে বিদেশযাত্রার বিকল্প না খুঁজলে এই মৃত্যুফাঁদ থেকে মুক্তি মিলবে না।