৯ এপ্রিলে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ও উপদেষ্টা মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে বৈঠকের খবর ও ছবি রীতিমত ভাইরাল হয়েছে নেট দুনিয়ায়।
মালয়েশিয়ায় কর্ম প্রত্যাশী যুবক থেকে রিক্রুটিং এজেন্সির এখন ব্যাপক কৌতহল কবে খুলছে মালয়েশিয়ার দরজা। এর মধ্যে বেশি দ্বিধা ও অনিশ্চয়তায় আছে বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। পূর্বের ধারাবাহিকতায় এবারও কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী প্রেরণের মাধ্যম হিসেবে নির্ধারণ করবে।
অপর দিকে কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও কর্মকর্তাদের উপস্থিতিও ইঙ্গিত করছে যে সহসাই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার তাদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ যৌথ প্রেস স্টেটমেন্টে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী মুক্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অনলাইন সিস্টেমে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করে কর্মী নির্বাচন ও নিয়োগ নিশ্চিত করবে। তাছাড়াও বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া অতিরিক্ত অভিবাসন খরচের চক্র থেকে বের হতে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুসরণ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে উভয় দেশ। এটি বাংলাদশের প্রত্যাশী কর্মীদের ও তাদের পরিবারের মধ্যেও বেশ ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করেছে।
এ পর্যন্ত উভয় দেশের দৃশ্যমান কর্মচঞ্চলতা উভয় সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ বলে সংশ্লিষ্টরা সাধুবাদ জানিয়েছেন, পাশপাশি উভয় সরকারের শক্তভাবে কমিটমেন্ট রক্ষার উপরও জোর দিয়েছেন। তবে, রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে ধোঁয়াশা রয়েছে এবং এটিকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে নানান গ্রুপ ও উপগ্রূপ তৈরি হয়েছে। ইতোমধ্যে তাদের কর্মতৎপরতা ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন একারণে যে, গত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে দুই বার সীমিত সংখ্যক এজেন্সির তালিকায় যারা ছিলো তাদের অনেকেই বাংলাদেশ নেই এবং তাদের বিরুদ্ধে দুদক, পুলিশ এবং আদালতে অর্থ পাচার, মানব পাচার ও দুর্নীতির মামলা রয়েছে। একই মামলায় তৎকালীন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ও সচিবের নামও রয়েছে।
বিগত সময়ে অর্থাৎ ১০ টি এজেন্সির সময় এবং ১০০ টি রিক্রুটিং এজেন্সির সময়ে এমন কিছু বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সির তৎপরতা, প্রতিবাদ, আন্দোলন চোখে পড়েছে যারা কখনোই মালয়েশিয়ার সিস্টেমে কর্মী প্রেরণের ডিমান্ড লেটার ও ক্ষমতা পত্র পায় নি তাদের আন্দোলন, মানব বন্ধন, স্মারক লিপি, মিডিয়ায় বক্তব্যে উল্লেখ করেছে যে, তারা তালিকাভুক্ত ১০০ রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী প্রতি ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দিয়েছে! যারা কর্মী প্রেরণের কোনো বৈধ ডিমান্ড লেটার ও ক্ষমতাপত্র পায় নি তারা কেন টাকা দিয়েছে এটিও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, দুদক, পুলিশ ও আদালতকে খতিয়ে দেখবে বলে অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা দাবি জানিয়েছেন।
কর্মী প্রেরণকারী সংস্থাগুলোর এভাবে নাজেহাল, হয়রানি এবং অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হলে বিদেশে কর্মী প্রেরণ প্রক্রিয়া নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠেছে তেমনি কর্মীরাও আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ এ বিষয়টি আসলেই রহস্যজনক এবং উভয় সরকারকে এই রহস্যময় খেলার শৃঙ্খল থেকে কর্মীদের মুক্ত করতে হবে।
মালয়েশিয়া সরকার যে এম্প্লয়ার পে মডেল চালু করতে এবং আইএলও মানদন্ড অনুসরণ করার যে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে সেটি বাস্তবায়ন করতে হলে অবশ্যই সকল ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধ করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াকে গোপনীয়তা ও ধোঁয়াশা মুক্ত করে সর্বোচ্চ স্বচ্ছ ও প্রশ্নমুক্ত করতে হবে। নইলে আবারও মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিকভাবে নানান বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যে পরার সম্ভাবনা আছে।
১০০ টি তালিকাভুক্ত এক এজেন্সি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ যাদের কর্মী প্রেরণ করার এমন কি বাছাই করার কোনো ক্ষমতা দেওয়া হয় নি তারা এর মধ্যে প্রবেশ করে পুরো প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তারাই কর্মী জোগাড় করে এনেছে কার কাছ থেকে কত টাকা নিয়েছে তারা সেগুলো মন্ত্রণালয়ের তদন্তে পরিষ্কার হয়েছে। এমনকি কর্মী প্রেরণ করতে পারে নি এমন এজেন্সির লেইলসেন্স নবায়ন করা না হলে তারা আপিলে বলেছে তারা মালয়েশিয়ায় হাজার হাজার কর্মী প্রেরণ করেছে! অর্থাৎ বিষয়টি পরিষ্কার যে মালয়েশিয়া সরকার নির্ধারিত এজেন্সির বাইরে তাদের প্রবেশ ঘটেছে। এরকম প্রবেশ ঘটানো সুযোগ দিলে এ প্রক্রিয়া কখনোই ভালো ফল দিবে না, উভয় দেশই নানান ঝামেলায় থাকবে।’
যৌথ বিবৃতিতে তুলনামুলক ভালো বাংলাদেশী রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রেরণের কাজগুলো সম্পাদনের উল্লেখ করা হয়েছে এবং উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে। মালয়েশিয়া দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে সকল উৎস দেশে রিক্রুটিং এজেন্সি নির্দিষ্ট করার জন্য ১০ টি শর্ত দিয়েছে। বাংলাদেশের রিক্রুটিং এজেন্সির ১০ টি শর্তের মধ্যে প্রথম ৩ টি শর্ত পূরণ করার সামর্থ্য নেই মর্মে মালয়েশিয়া সরকারকে লিখিতভাবে জানিয়েছে।
মালয়েশিয়া এ বিষয়ে কোনো জবাব না দিলেও বাংলাদেশ একতরফাভাবে সেই তিনটি শর্ত শিথিল করেই রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ার নিকট সংসদ নির্বাচনের আগেই হস্তান্তর করেছে। কিন্তু সেই তালিকায় কতটি এবং কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সির নাম আছে কেউই জানে না! এটি ধোঁয়াশা তৈরি করেছে এবং এটিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় নানান গুঞ্জন উঠেছে ইতোমধ্যে। বাংলাদেশ থেকে কর্মী প্রেরণ কোনো গোপন বিষয় নয় এবং দেশের নাগরিকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অবশ্যই স্বচ্ছতা বা খোলাখুলি অবস্থান সরকারের থাকা উচিত ছিল বলে অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ সরকারের গোপন তৎপরতা প্রতিবারই ছিলো, এমন কি অন্তর্বর্তী সরকার একই কাজ করেছে। আমরা আশা করি বর্তমান সরকার সবকিছু স্বচ্ছ করবেন। যে তালিকা দিয়েছে সেটি প্রকাশ করুক, আমরা দেখি তারা আসলেই সেই ১০টি বা ৭ টি শর্ত পূরণ করেছে কি না।
যদি পূরণ করে থাকে এবং যাদের ওযোগ্য করা হয়েছে সেগুলো যদি জানতে পারি তাহলে আমাদের কোনো কিছু বলার থাকবে না। সরকারের সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিব সসম্মানে। ‘ উল্লেখ্য, বাংলাদেশ দক্ষ, অভিজ্ঞ, যোগ্য এবং ক্লিন ট্র্যাক রেকর্ডের অধিকারী রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়াকে দিবে এমন শর্ত সমঝোতা স্মারকে লেখা আছে মর্মে অন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টা এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন। মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এআইভিত্তিক অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন: একজন সাবেক সংসদ সদস্য চার্লস সান্তিয়াগো এবং জননীতি বিশ্লেষক ভি ঐশ্বর্যা মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে অভিবাসী শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের জন্য শূন্য ব্যয় নিশ্চিত করা।
তারা জানতে চান, এই নতুন ব্যবস্থা চালুর আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়েছে কিনা এবং এটি বাস্তবায়নে সরকারের কত খরচ হবে। এছাড়া, তারা জানতে চান নতুন এই নিয়োগ ব্যবস্থা বিদ্যমান ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) থেকে কীভাবে ভিন্ন হবে। তাদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আমাদের মনে রাখা উচিত, এফডব্লিউসিএমএস এমন একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, যা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শ্রমিকদের কাছ থেকে ফি আদায় করত।
শুধুমাত্র ‘এআই’ ট্যাগ দিলেই শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা দূর হয় না। নতুন এই প্ল্যাটফর্ম একই সমস্যায় না পড়তে কী ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হবে? তারা আরও প্রশ্ন তোলেন মানবসম্পদ মন্ত্রী আর রামানান-এর বক্তব্য নিয়ে, যেখানে বলা হয়েছিল এআইভিত্তিক এই সিস্টেম মধ্যস্বত্বভোগীদের বাদ দেবে এবং শ্রমিকদের জন্য শূন্য খরচ নিশ্চিত করবে।
তাদের মতে, বাস্তবে অনেক অভিবাসী শ্রমিক মালয়েশিয়ায় কাজ পাওয়ার জন্য নিজ নিজ গ্রামের অনানুষ্ঠানিক দালালদের ফি প্রদান করে থাকে। ফলে এই সিস্টেম কীভাবে এসব লেনদেন নজরদারি করবে, তা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে তারা জানতে চান, এই এআই সিস্টেমটি কে তৈরি করবে এবং কে এর নিয়ন্ত্রণে থাকবে? বেস্টিনেট-এর এফডব্লিউসিএমএস প্রকল্পটি যথাযথ উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই দেওয়া হয়েছিল এবং ছয় বছর কোনো চুক্তি ছাড়াই পরিচালিত হয়েছিল। নতুন এআই প্ল্যাটফর্ম কি স্বচ্ছ সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে, নাকি সরাসরি আলোচনার ভিত্তিতে দেওয়া হবে?
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঘিরে এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। সীমিত এজেন্সি নাকি উন্মুক্ত ব্যবস্থা যে পথই বেছে নেওয়া হোক, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।