আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে আবারও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের নাম। মালয়েশিয়া প্রবাসী বিশিষ্ট বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান টেকসই জ্বালানি গবেষণায় বিশ্বসেরার আসন ধরে রেখে নতুন ইতিহাস গড়েছেন। সর্বশেষ প্রকাশিত স্কলার জিপিএস (ScholarGPS) র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, টেকসই জ্বালানি (Sustainable Energy) ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি গবেষণায় তিনি বিশ্বের ১ম স্থান অর্জন করেছেন।
এটি কোনো এককালীন সাফল্য নয়—২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা চার বছর ধরে তিনি এই শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন। তার এই ধারাবাহিক সাফল্য বিশ্ব গবেষণা অঙ্গনে এক বিরল নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এডি সায়েন্টিফিক ইনডেক্স র্যাঙ্কিং ২০২৬-এ ড. সাইদুর রহমান মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় মালয়েশিয়ায় ১ম, এশিয়ায় ১ম এবং বিশ্বে ৬ষ্ঠ স্থান অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—গত বছর তিনি একই তালিকায় বিশ্বে ৭ম অবস্থানে ছিলেন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছেন।
এই র্যাঙ্কিংয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি/মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে বিশ্বের ৩৩,৪২২ জন বিজ্ঞানীর মধ্যে তার এই অবস্থান নিঃসন্দেহে অসাধারণ অর্জন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি শুধু ধারাবাহিকই নন, বরং প্রতিনিয়ত নিজের গবেষণার মান উন্নত করে চলেছেন।
২০২৫ সালে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং এলসেভিয়ার-এর যৌথ বিশ্লেষণে প্রকাশিত বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকাতেও ড. সাইদুর রহমান উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। সেখানে মালয়েশিয়ার বিজ্ঞানীদের মধ্যে এনার্জি গবেষণায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন।
এই অর্জন তার গবেষণার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাবেরই প্রতিফলন।
গুগল স্কলারের তথ্য অনুযায়ী, ড. সাইদুর রহমানের এইচ-ইনডেক্স ১৪৮—যা বিশ্বমানের গবেষকদের মধ্যেও অত্যন্ত উচ্চ। তার গবেষণাকর্মে সাইটেশনের সংখ্যা ৮৭ হাজারেরও বেশি, যা তার কাজের ব্যাপক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দেয়।
তিনি ময়মনসিংহ জেলার কৃতি সন্তান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সাবেক শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ার স্বনামধন্য সানওয়ে ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করছেন।

২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত নিজ গবেষণা ক্ষেত্রে শীর্ষ ১ শতাংশ গবেষকদের মধ্যে থাকার জন্য তিনি ক্ল্যারিভেট অ্যানালিটিক্স কর্তৃক “বিশ্বসেরা গবেষক” হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তার গবেষণা মালয়েশিয়ার উচ্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃকও আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে।
ন্যানোম্যাটেরিয়াল ও ন্যানোফ্লুইড এমএক্সিন-ভিত্তিক ন্যানোম্যাটেরিয়াল গবেষণায় স্কোপাস ডেটা বিশ্লেষণে তিনি মালয়েশিয়ায় ১ম স্থান অর্জন করেছেন। অন্যদিকে, ন্যানোফ্লুইড গবেষণায় ওয়েব অব সায়েন্স অনুযায়ী তিনি বিশ্বে ১ম স্থানে অবস্থান করছেন।
তার গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে, টেকসই জ্বালানি প্রযুক্তি, এনার্জি স্টোরেজ, সৌর শক্তি, উন্নত উপাদান বিজ্ঞান বিশুদ্ধ পানি উন্নয়নশুধু গবেষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে, ড. সাইদুর রহমান তরুণ গবেষকদের অনুপ্রাণিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রায় ২৮ বছরের গবেষণা অভিজ্ঞতা তিনি নিয়মিত অনলাইন সেমিনার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং একটি ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে শেয়ার করছেন। এছাড়া, অসহায় ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তায়ও তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন—যা তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিচয় বহন করে।
নিজস্ব উদ্যোগে ১৫ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি ব্যয়ে তিনি সানওয়ে ইউনিভার্সিটিতে একটি অত্যাধুনিক গবেষণাগার স্থাপন করেছেন। এই ল্যাবরেটরিতে জ্বালানি প্রযুক্তি, উন্নত উপাদান, এনার্জি স্টোরেজ, সৌর শক্তি এবং বিশুদ্ধ পানি উন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালিত হচ্ছে। এটি শুধু তার ব্যক্তিগত বিনিয়োগ নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি শক্তিশালী গবেষণা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার প্রয়াস।
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ সরকার তাকে “বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি” (সিআইপি) সম্মাননা প্রদান করে।
নিজের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সম্পর্কে ড. সাইদুর রহমান বলেন— “এই অর্জন কোনো একক ব্যক্তির নয়। শিক্ষার্থী, গবেষণা দল, সহকর্মী, প্রতিষ্ঠান ও অর্থায়নকারী সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে।” তার এই বক্তব্য তার বিনয়ী মনোভাব ও দলগত কাজের প্রতি শ্রদ্ধারই প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হলেও তিনি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক অটুট রেখেছেন। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি যৌথ গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ড. সাইদুর রহমানের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি বাংলাদেশের পাশাপাশি মালয়েশিয়ার উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তার এই সাফল্য প্রমাণ করে, মেধা, অধ্যবসায় ও সঠিক দিকনির্দেশনা থাকলে একজন গবেষক বৈশ্বিক অঙ্গনে কতটা বড় প্রভাব ফেলতে পারেন।
ভবিষ্যতেও শিক্ষা ও গবেষণায় নতুন নতুন মাইলফলক অর্জনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন ড. সাইদুর রহমান। তার নেতৃত্বে টেকসই জ্বালানি খাতে আরও যুগান্তকারী গবেষণা বিশ্বকে সমৃদ্ধ করবে—এমনটাই আশা সংশ্লিষ্ট মহলের।
ড. সাইদুর রহমানের এই অসামান্য সাফল্য শুধু একজন বিজ্ঞানীর নয়—এটি পুরো জাতির গর্ব, যা নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে ও এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।