সুস্থ জীবনের জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই। শিশু ও বৃদ্ধদের মতো কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য সঠিক পুষ্টি এবং নিয়মিত যত্নের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি। কেবল সুস্বাদু খাবার খেলেই হবে না, বরং কোন খাবারে কী ধরনের পুষ্টি রয়েছে এবং শরীরের বৃদ্ধিতে তার ভূমিকা কতটুকু, সে সম্পর্কেও কিশোর-কিশোরীদের স্বচ্ছ ধারণা থাকা জরুরি।
কৈশোর হলো জীবনের এমন এক সন্ধিক্ষণ, যেখানে সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাত্রা ভবিষ্যৎ সুস্বাস্থ্যের ভিত্তি গড়ে দেয়। রোগ-ব্যাধি থেকে দূরে থেকে নিজেকে সবল ও কর্মক্ষম করে গড়ে তুলতে নিচের অভ্যাসগুলো চর্চা করা প্রয়োজন:
১. সুষম খাদ্যাভ্যাস: মাছ, মাংস ও শাক-সবজির সমন্বয়
বাড়ন্ত বয়সে শরীরে প্রচুর পরিমাণে আমিষ, ক্যালরি, খনিজ লবণ ও স্নেহের প্রয়োজন হয়।আমিষের উৎস: গরু, খাসি ও মুরগির মাংস হলো প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস। আবার ডাল বা শস্যজাতীয় খাবার থেকে পাওয়া যায় উদ্ভিদজ আমিষ। এই দুই ধরনের আমিষই শরীরের টিস্যু গঠনে কার্যকর। শাক-সবজির গুরুত্ব: শুধু মাংস খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও হজমের সমস্যা হতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শাক-সবজি ও ছোট মাছ রাখা আবশ্যক। টাটকা খাবার: ফ্রিজে রাখা বা বাসি খাবারের চেয়ে টাটকা খাবারের পুষ্টিগুণ অনেক বেশি। তাই সব সময় টাটকা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
২. অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা
যাদের ওজন তুলনামূলক বেশি, তাদের অতিরিক্ত তৈলাক্ত বা চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা উচিত। বিশেষ করে যাদের পরিবারে উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের ইতিহাস রয়েছে, তাদের কৈশোর থেকেই ফাস্টফুড, আইসক্রিম ও অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রণে রাখা ভালো। মাংস খাওয়ার পরপরই দুধ বা আইসক্রিম না খাওয়া উত্তম, কারণ দুটি ভিন্ন ধরনের উচ্চ-প্রোটিন একসঙ্গে হজমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
৩. আয়রনের অভাব দূর করতে কলিজা ও শাক-সবজি
কৈশোরে শরীরের অভ্যন্তরীণ গঠনের জন্য আয়রন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কলিজা হলো আয়রনের অন্যতম প্রধান উৎস। এছাড়া রক্তস্বল্পতা দূর করতে নিয়মিত ডালিম, কচুর শাক, কচুর লতি ও কাঁচকলা খাওয়া উচিত। যারা নিয়মিত খেলাধুলা, নাচ বা শারীরিক কসরত করে, তাদের জন্য এই খাবারগুলো শক্তির প্রধান উৎস।
৪. পর্যাপ্ত পানি পান
শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখতে এবং বিষাক্ত উপাদান বের করে দিতে প্রতিদিন অন্তত দেড় থেকে দুই লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করা জরুরি।
৫. হাড় ও দাঁতের গঠনে ‘পায়া’ বা নিহারী
গরু বা খাসির পা দিয়ে তৈরি ‘পায়া’ বা নিহারীতে প্রচুর ক্যালসিয়াম ও খনিজ লবণ থাকে। কিশোর বয়সে মজবুত হাড়, দাঁত, নখ ও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য এই খাবারগুলো অত্যন্ত উপকারী।
৬. কায়িক শ্রম, ব্যায়াম ও পরিচ্ছন্নতা
কেবল খাবার নয়, সুস্বাস্থ্যের জন্য শারীরিক পরিশ্রমও জরুরি। পারিবারিক কাজ: ঘরোয়া কাজে বাবা-মাকে সাহায্য করার অভ্যাস হাড়ের সঠিক বর্ধন ও শরীরচর্চায় ভূমিকা রাখে। দাঁতের যত্ন: মাংস, মিষ্টি বা কোমল পানীয় খাওয়ার পর নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রাথমিক চিকিৎসা: বাসায় সব সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও ফার্স্ট এইড বক্স হাতের কাছে রাখা উচিত। বিশেষ করে যাদের নিয়মিত কোনো ওষুধ (যেমন: থাইরয়েড বা অ্যালার্জি) সেবন করতে হয়, তারা যেন এ ব্যাপারে সচেতন থাকে।
৭. স্বাস্থ্যবিধি ও নৈতিকতা
পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জনাকীর্ণ স্থানে মাস্ক ব্যবহার ও নিয়মিত হাত ধোয়ার মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা উচিত। এছাড়া কিশোর বয়স থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার চর্চা মনকে শান্ত রাখতে এবং বিপথে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে বিশেষ সহায়তা করে। সামান্য কিছু সতর্কতা এবং সঠিক খাদ্যাভ্যাস কিশোর-কিশোরীদের একটি উজ্জ্বল ও নিরোগ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
লেখক ও চিকিৎসক।