ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট, শেয়ারবাজারে পতন এবং উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম Al Jazeera-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই সংকটের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
জ্বালানি বাজারে তীব্র চাপ
সংঘাত শুরুর পর উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বিশেষ করে Strait of Hormuz দিয়ে জ্বালানি পরিবহন কমে যাওয়ায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বে মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যায়।
ফলে অল্প সময়েই ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার থেকে ১০৬ ডলারে উঠে গেছে। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)-এর দামও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে তেলের দাম ১৩০ থেকে ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এশিয়ায় সরবরাহ সংকট
চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সরবরাহ কমে যাওয়ায় এসব দেশ বিকল্প উৎস খুঁজছে, যা ব্যয় আরও বাড়াচ্ছে এবং আমদানি খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
উৎপাদন ও অর্থনীতিতে প্রভাব
জ্বালানির দাম বাড়ায় বিভিন্ন দেশে উৎপাদন খাতে চাপ তৈরি হয়েছে। খরচ কমাতে কিছু দেশে কর্মঘণ্টা কমানো, বাসা থেকে কাজ এবং জ্বালানি ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে শিল্প ও সেবা খাতে উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব
সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও পতন দেখা গেছে। গড়ে বিশ্বজুড়ে শেয়ারের দাম প্রায় ৫ শতাংশের বেশি কমেছে। জাপান, ভারতসহ এশিয়ার বাজারগুলোতে পতন তুলনামূলক বেশি। বিপরীতে জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে কিছু বাজার লাভবানও হচ্ছে।
মুদ্রাস্ফীতি ও মন্দার ঝুঁকি
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। অতীতে তেলের দামের ধাক্কায় ১৯৭৩, ১৯৭৮ ও ২০০৮ সালে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা দেখা গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ঋণ সংকটের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।
প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি
সংঘাত দ্রুত শেষ না হলে ইউরোপ ও এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যেতে পারে। চীনের প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে নামার আশঙ্কা রয়েছে, আর ইউরোপে প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে।
ভ্রমণ ও বিমান খাতে চাপ
জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিমান ভাড়া বাড়ছে। উপসাগরীয় আকাশপথ আংশিকভাবে সীমিত হওয়ায় ফ্লাইট ঘুরিয়ে চালাতে হচ্ছে, ফলে সময় ও খরচ উভয়ই বাড়ছে। এতে বৈশ্বিক পর্যটন খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দিচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা—সবকিছুর ঝুঁকি আরও বাড়বে।