যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর যৌথ সামরিক অভিযানের মুখে পাল্টা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইরান। ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতেও একের পর এক হামলা চালাচ্ছে তেহরান।
যুদ্ধে ইরানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও প্রচণ্ড চাপের মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলও। প্রতিদিন যুদ্ধ ব্যয় বাড়তে থাকায় দুই দেশের সরকারই ক্রমশ চাপে পড়ছে। এর পাশাপাশি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজার।
এ পরিস্থিতিতে প্রণালিটি সচল করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মিত্র দেশগুলোর কাছে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি যুক্তরাজ্য ও চীন-সহ বিভিন্ন দেশকে সহায়তার আহ্বান জানান এবং ন্যাটো-কেও কঠোর হুঁশিয়ারি দেন। কিন্তু সংকটের এই সময়ে মিত্রদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফলে ইসরায়েলের উসকানিতে সাড়া দিয়ে তিনি একপ্রকার কৌশলগত চাপে পড়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একদিন আগেই মিত্রদের সতর্ক করে ট্রাম্প বলেছেন—যুক্তরাজ্যসহ মিত্র দেশগুলো যদি এই অঞ্চলে সামরিক সহায়তা না দেয়, তাহলে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের জবাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, ওই অঞ্চলে অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিজেদের ও মিত্রদের সুরক্ষা দেওয়া—এটাই যুক্তরাজ্যের প্রধান অগ্রাধিকার।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাজ্য কোনো বৃহৎ আকারের সংঘাতে জড়াতে চায় না। বরং ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ট্রাম্প ও স্টারমারের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালাতে অনুমতি না দেওয়ায় ট্রাম্প এর আগে স্টারমারের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি তাকে ঐতিহাসিক নেতা উইনস্টন চার্চিল-এর ‘বিপরীত’ বলেও কটাক্ষ করেন।
এদিকে ইরান যুদ্ধকে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ’ আখ্যা দিয়ে এতে জড়াতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ফ্রান্স। একইভাবে যুদ্ধে অংশ নিতে ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে জার্মানি। এমনকি হরমুজ প্রণালি সামরিক শক্তি দিয়ে সচল রাখার উদ্যোগেও অংশ নেবে না বলে জানিয়েছে দেশটি। এছাড়া প্রণালিতে কোনো সামরিক তৎপরতায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে গ্রিস।
ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দেয়নি তার এশীয় মিত্ররাও। দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং পরিস্থিতি ‘সতর্কভাবে পর্যালোচনা’ করার পর সিদ্ধান্ত নেবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপান ও অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে সামরিক পাহারা দিয়ে পার করানোর কোনো পরিকল্পনা তাদের নেই।
উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চলে। তবে কোনো সমঝোতা ছাড়াই সেই সংলাপ শেষ হয়।
এর পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে। একই সময় ইসরায়েলও ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ নামে অভিযান চালায়। এই যৌথ সামরিক অভিযানে প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবারের সদস্যরা। এছাড়া নিহত হন ইরানের সেনাবাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কমান্ডারও।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোর ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। টানা ১৭ দিন ধরে চলা হামলা ও পাল্টা হামলায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন ভয়াবহ যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।