পর্তুগালে রাজধানি লিসবনে ভুয়া কর্মসংস্থান চুক্তির মাধ্যমে অভিবাসী বৈধকরণের অভিযোগে ছয়টি কোম্পানিসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করেছে পর্তুগালের পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস তাছাড়া পর্তুগিজ সংবাদ মাধ্যমে আরো বিস্তারিত উঠে এসেছে । অভিযোগপত্রটি চলতি সপ্তাহের বুধবার এটর্নি জেনারেল অফিসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়, যেখানে বলা হয়েছে যে এই নেটওয়ার্ক মিথ্যা চাকরির চুক্তি দেখিয়ে হাজার হাজার অভিবাসীকে বৈধতা দিয়েছে এবং এর মাধ্যমে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে পরিচালিত অপারেশন ‘কন্ট্রাটো ফর্মোসো’ এর সময় লিসবনের মার্টিম মুনিজ এলাকার রুয়া দো বেনফরমোসোকে কেন্দ্র করে এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দেয়া হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন মুস্তাফিজ সেরনিয়াবাত নামের এক ব্যবসায়ী।
এলাকাটিতেই তার একটি দোকান এবং একটি কোম্পানি ছিল, যা ব্যবহার করে অভিবাসীদের ভুয়া কর্মসংস্থান চুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তায় মিথ্যা অবদানের ইতিহাস তৈরি করা হতো, যাতে তারা বসবাসের অনুমতি পেতে পারে।
কীভাবে চলত বৈধকরণের ব্যবসা
অভিযোগ অনুযায়ী, আইন পরিবর্তনের ফলে “পর্তুগালে থাকার ইচ্ছা” প্রদর্শনের ভিত্তিতে রেসিডেন্স পারমিটের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় মুস্তাফিজ সেরনিয়াবাত ও তার সহযোগীরা একটি পরিকল্পিত বাণিজ্যিক স্কিম গড়ে তোলেন।
পর্তুগালে থাকতে আগ্রহী প্রতিটি বিদেশি নাগরিকের কাছ থেকে প্রায় ছয় হাজার ইউরো পর্যন্ত ফি নেওয়া হতো, যার মধ্যে ভুয়া কর্মসংস্থান চুক্তি, সামাজিক নিরাপত্তার অবদান এবং অন্যান্য কাগজপত্র সমন্বিত একটি ‘সম্পূর্ণ পরিষেবা’ প্যাকেজ দেওয়া হতো।
প্রসিকিউশনের হিসেব অনুযায়ী, ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত মুস্তাফিজ সেরনিয়াবাত বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৪৪৮,৫২২.৯৯ ইউরো জমা হয়েছে, যা বিদেশি নাগরিকদের বৈধকরণ সংক্রান্ত পরিষেবার নামে আদায় করা অর্থ থেকে এসেছে।
তিনি ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের অক্টোবরের মধ্যে মোট ১৬৫ জনকে তার কোম্পানি “সেলিম এন্ড বাদশা এলডিএ” এর কর্মী দেখিয়ে নথি তৈরি করেন; অধিকাংশই পাকিস্তান ও ভারতের নাগরিক, যারা কখনও কোম্পানিটির জন্য কাজ করেননি।
কিন্তু ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই কোম্পানির নামে সামাজিক নিরাপত্তায় নিবন্ধিত প্রকৃত কর্মীর সংখ্যা ছিল মাত্র ৪২ জন, যা অফিসিয়াল অবদান ও ভুয়া কর্মী তালিকার মধ্যে বড় ধরনের অমিল তৈরি করে।
ভুয়া আবাসন সনদ ও স্বাক্ষর ব্যবসা
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নেটওয়ার্কের কয়েকজন সহযোগী আর্থিকভাবে দুর্বল পর্তুগিজ নাগরিকদের খুঁজে বের করতেন, যারা ভুয়া আবাসন প্রত্যয়নপত্রে সাক্ষী হিসেবে নাম ও স্বাক্ষর দিতে রাজি হতেন।
প্রতি স্বাক্ষরের বিনিময়ে ১০ থেকে ২৫ ইউরো পর্যন্ত দেওয়া হতো; মামলায় এমন তিনজন আসামি আছেন যারা এই প্রতারণামূলক ‘সাক্ষী পরিষেবা’ দিতে সম্মত হন, তাদের মধ্যে একজন একাই ৩১৫ জন অভিবাসীর আবাসস্থলের সাক্ষ্য দিয়েছেন, প্রতি জনের জন্য ২৫ ইউরো করে।
প্রসিকিউটরদের মতে, মুস্তাফিজ বুঝতে পারেন যে একক কোম্পানির মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য সংখ্যক কর্মসংস্থান চুক্তি দেখানো সম্ভব হচ্ছে না।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে তিনি বেশ কয়েকজন বিদেশিকে নেটওয়ার্কে যুক্ত করেন, যাদের দায়িত্ব ছিল নিজেদের পরিচালিত বা নতুন গড়া কোম্পানিগুলোকে ‘নিয়োগকর্তা’ হিসেবে কাগজে দেখানো এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সামাজিক নিরাপত্তায় কাল্পনিক অবদান প্রদান করে এক বছরের কর্মসংস্থান সম্পর্ক তৈরি করা।
এভাবে তিনি অন্তত চারজন নতুন সদস্যকে যুক্ত করেন, যারা নিজেদের নামে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন বা আগের কোম্পানি নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্যে “ধার” দেন।
“পজিটিভ ই সিমপাটিকো” ও কৃষি খাতের নাম ব্যবহার
লরেস পৌরসভায় অভিযুক্ত মোঃ উজ্জল হুসাইন এবং তার কোম্পানি “পজিটিভ ই সিমপাটিকো” এর নামও এই মামলায় উঠে এসেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানিটির নামে কৃষি কাজের অজুহাতে ১,৮১৭টি কর্মসংস্থান চুক্তি ইস্যু করা হয়, যদিও কোম্পানির নিবন্ধিত ঠিকানা আসলে একটি ছোট খামার, যেখানে শুধু সীমিত পরিসরে জীবিকা নির্বাহের কৃষিকাজ হয়।
২০২৩ সালে এই কোম্পানি তাদের ইস্যুকৃত ১,৮১৭টি চুক্তির মধ্যে মাত্র ৪২৯ জনকে সামাজিক নিরাপত্তায় নিবন্ধিত করে, বাকি বিপুল সংখ্যক চুক্তি কেবল অভিবাসী বৈধকরণের কাগুজে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে।
প্রসিকিউশনের ব্যাখ্যায়, অভিযুক্ত কোম্পানিগুলোর আসলে কার্যকর কোনো ব্যবসা ছিল না তারা কোনো নিয়মিত পরিষেবা দিত না, বাস্তবে কাজ করা কর্মী, সরবরাহকারী বা ক্লায়েন্টের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতিও ছিল না।
এসব প্রতিষ্ঠান শুধু কর্তৃপক্ষের কাছে এমন ধারণা তৈরি করার জন্য ব্যবহার করা হতো যে তারা পর্তুগালে সক্রিয়ভাবে ব্যবসা করছে এবং শত শত বিদেশি তাদের অধীনে কাজ করছে, যদিও বাস্তবে তা ছিল না।
আন্তর্জাতিক পরিসর ও ডিজিটাল যোগাযোগ
বুধবার প্রকাশিত বিবৃতিতে পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এই নেটওয়ার্ককে “বৈশ্বিক পরিধি”সম্পন্ন বলে উল্লেখ করেছে, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি নাগরিকদের জন্য কাজের ভিসা সংগ্রহ করে তাদের ইউরোপে প্রবেশ ও অবস্থানের পথ তৈরি করা।
অভিযোগে বলা হয়, এক আসামি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেও আরও দুজন বিদেশে অবস্থান করে এই সংগঠনের কার্যক্রম সমন্বয় করতেন।
এছাড়া মুস্তাফিজ সেরনিয়াবাত ও ভারতে বসবাসকারী এক ব্যক্তির মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা আদান প্রদানের তথ্যও মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেখানে “প্রদত্ত পরিষেবার জন্য অর্থ প্রদান” এর উল্লেখ পাওয়া গেছে বলে প্রসিকিউটররা জানায়।
আইনি অভিযোগের ধরন ও পরবর্তী ধাপ
মুস্তাফিজ সেরনিয়াবাতের বিরুদ্ধে রয়েছে অবৈধ অভিবাসনে সহায়তার জন্য অপরাধী সংগঠনে জড়িত থাকার একটি অভিযোগ, অবৈধ অভিবাসনে সহায়তা করার ১৬৫টি পৃথক অভিযোগ, ধারাবাহিক নথি জালিয়াতির একটি অভিযোগ এবং সহযোগী হিসেবে অবৈধ অভিবাসনে সহায়তার আরও ১,৭৭৫টি অভিযোগ; প্রায় একই ধরণের অভিযোগ তার সহযোগী মোহাম্মদ রেজার বিরুদ্ধেও আনা হয়েছে।
মোটকথা, ছয়টি কোম্পানিসহ ১৫ জন আসামির বিরুদ্ধে অবৈধ অভিবাসনে সহায়তা, নথি জালিয়াতি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অপরাধ মিলিয়ে হাজার হাজার অভিযোগের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা সংখ্যার হিসেবে কয়েক হাজার অপরাধকর্মের দায় নির্দেশ করে।
তদন্তটি লিসবনের তদন্ত ও অপরাধ দমন বিভাগ (ডিইএপি) এর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন হয়েছে এবং এতে সহায়তা করেছে “জুডিসিয়ারি পুলিশ” এর জাতীয় সন্ত্রাস দমন ইউনিট, পুরো প্রক্রিয়াটিকে আইনিভাবে “বিশেষভাবে জটিল” মামলা হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়েছে।
এখন মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে অগ্রসর হওয়ার অপেক্ষায়, যেখানে আদালত প্রমাণ যাচাই করে আসামিদের দায়-দায়িত্ব ও সম্ভাব্য শাস্তি নির্ধারণ করবে।