ইসরায়েলের প্রধান আন্তর্জাতিক টার্মিনাল বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লব গার্ড কোর (আইআরজিসি)। তাদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন ঘাঁটি এবং শহরের ওপর চালানো সাম্প্রতিক হামলায় ‘নতুন প্রজন্মের’ ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্য হিসেবে তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর, হাইফা এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনার নাম উল্লেখ করেছে আইআরজিসি।
আইআরজিসির বিবৃতি কী বলছে
আইআরজিসির জনসংযোগ শাখা থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ট্রু প্রমিস’ শিরোনামের ধারাবাহিক অভিযানের ২২তম ধাপে উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে খাইবার, খোররামশাহর–৪ এবং ফাত্তাহসহ নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, তেল আবিব, বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর এবং হাইফার সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। আইআরজিসি আরও বলেছে, এ সব আঘাতের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যূহ এখনো অক্ষুণ্ণ এবং পশ্চিমা গণমাধ্যম যে ‘ইরানের সামরিক ক্ষমতা দুর্বল হয়েছে’—এমন ধারণা ছড়াচ্ছে, তা সঠিক নয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয়মুখী সংবাদমাধ্যম ও আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মগুলোতে প্রকাশিত আরেক বিবৃতিতে বলা হয়, বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভবনে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোনের সমন্বিত আঘাত হানা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এই হামলা সাম্প্রতিক মার্কিন–ইসরায়েলি বোমা হামলার ‘সরাসরি প্রতিশোধ’।
ইসরায়েলি পক্ষের প্রতিক্রিয়া
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সব দাবি স্বীকার করা হয়নি। প্রাথমিকভাবে সামরিক বাহিনী ও সরকার–ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটকেছে; কিছু ক্ষেপণাস্ত্র তেল আবিব ও আশপাশের এলাকায় আঘাত হানার চেষ্টা করলেও বিমানবন্দর–সংলগ্ন অধিকাংশ লক্ষ্যবস্তু রক্ষা করা গেছে বলে দাবি তাদের। তবে কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার পর কিছু সময়ের জন্য বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক ফ্লাইট বন্ধ রাখা হয় এবং রানওয়ে ও অবকাঠামো নিরাপত্তা–ঝুঁকি যাচাইয়ে জরুরি তল্লাশি চালানো হয়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এখন পর্যন্ত বিমানবন্দরে সরাসরি বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। বরং তারা বলছে, দেশজুড়ে বহুপদক্ষেপ প্রতিরক্ষাব্যূহ—এরো, ডেভিড’স স্লিংসহ—মোটের ওপর ‘কার্যকর’ ছিল এবং অধিকাংশ হামলাই সীমান্তের বাইরে বা প্রতিরক্ষা ঢালে ঠেকানো গেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টিভি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তেল আবিব ও আশপাশে সতর্কতা–সাইরেন বেজে ওঠার পর জনজীবন কিছু সময়ের জন্য অচল হয়ে পড়ে, মানুষ দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটে যায়।
উপসাগরীয় ঘাঁটি ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছে, শুধু ইসরায়েল নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও এই ‘নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্রের’ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। তালিকায় সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের ভেতরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও স্বাধীন উৎস থেকে সব দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। পর্যবেক্ষকদের মতে, সিরিজ আকারে চালানো এই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল–ইরান উত্তেজনাকে নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি বিশ্লেষণ বলছে, ইসরায়েলি হামলায় ইরানের ভেতরে সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির জবাব হিসেবেই তেহরান এই অভিযান শুরু করেছে। এতে একদিকে যেমন ইরান তার ‘প্রতিরোধ সক্ষমতা’ প্রদর্শন করতে চাইছে, অন্যদিকে উপসাগরীয় ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের ওপর চাপ বাড়ানোরও কৌশল দেখা যাচ্ছে।
বেসামরিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
বেন গুরিয়ন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইসরায়েলের প্রধান আকাশ–দ্বার; দেশটির অধিকাংশ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এই টার্মিনাল দিয়েই পরিচালিত হয়। সাম্প্রতিক হামলা ও হুমকির প্রেক্ষাপটে আগের কয়েক দফা হুথি ও ইরান–সমর্থিত গোষ্ঠীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকেই এই বিমানবন্দরকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ স্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত বছর আলাদা এক ঘটনায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নিক্ষেপিত ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের নিকটবর্তী এলাকায় আঘাত হানার পর কয়েক ঘণ্টার জন্য বিমান চলাচল বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
সাম্প্রতিক ইরানি হামলার দাবির পর জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক পক্ষ মধ্যপ্রাচ্যে ‘বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলোও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে; আগের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেক সংস্থা তেল আবিবগামী ফ্লাইট সূচিতে পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে