ইরানের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার উত্থান শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; বরং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রব্যবস্থা, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি প্রক্রিয়া। কয়েক দশক ধরে তিনি দেশটির সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে যে প্রভাব বজায় রেখেছিলেন, তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, বিপ্লবী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা, রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হওয়া বিশেষ পরিস্থিতি।
১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেওয়া খামেনি ছোটবেলা থেকেই ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। মাশহাদে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি শিয়া মুসলিমদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র কোমে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষায় যোগ দেন। সেখানে তিনি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির চিন্তাধারায় গভীরভাবে প্রভাবিত হন এবং শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির শাসনের বিরুদ্ধে ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন।

ষাটের দশক থেকেই খামেনি শাহবিরোধী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। এই সময় একাধিকবার তাকে গ্রেফতার ও কারাবরণ করতে হয়। বিপ্লবপূর্ব এই রাজনৈতিক সংগ্রাম তাকে খোমেনির ঘনিষ্ঠ অনুসারীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং পরবর্তী সময়ের ক্ষমতার কাঠামোয় প্রবেশের পথ তৈরি করে।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের পতনের পর নতুন ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে খামেনি বিপ্লবী পরিষদের সদস্য হন। পরে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংগঠনে ভূমিকা রাখেন, যা পরবর্তীতে ইরানের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯৮১ সালে তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন খামেনি এবং তার ডান হাত আংশিকভাবে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। একই বছর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী রাজাই নিহত হলে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় ইরান-ইরাক যুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠন এবং বিপ্লব-পরবর্তী ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরির মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

ছবি- ইন্টারনেট থেকে।
খামেনির জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর। ইরানের সংবিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্ব অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নামের ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদের ওপর ন্যস্ত। খোমেনির মৃত্যুর পর এই পরিষদ খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচন করে। তবে তখন তিনি সংবিধানে নির্ধারিত ‘গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ’ মর্যাদায় পৌঁছাননি। এই জটিলতা কাটাতে সংবিধানে সংশোধন আনা হয় এবং তার ধর্মীয় পদমর্যাদা দ্রুত উন্নীত করা হয়, যাতে তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নিতে পারেন।
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর খামেনি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, বিচার বিভাগের প্রধান নিয়োগকারী, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের নিয়ন্ত্রক এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্য মনোনয়নকারী হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত তার অনুমোদন ছাড়া কার্যকর হতো না।
তার নেতৃত্বের সময় ইরান নানা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে—২০০৯ সালের নির্বাচনের পর আন্দোলন, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড, অর্থনৈতিক চাপ এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভ—সব ক্ষেত্রেই তিনি রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
খামেনি তার ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে একটি অনুগত রক্ষণশীল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস, গার্ডিয়ান কাউন্সিল এবং আইআরজিসির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি রাজনৈতিক ভারসাম্য নিজের পক্ষে রাখেন। ফলে ইরানের নির্বাচনী ব্যবস্থায় জনগণের ভোট থাকলেও ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রণ সর্বোচ্চ নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।
ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোয় সর্বোচ্চ নেতা আজীবন দায়িত্বে থাকতে পারেন। সেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়েই খামেনি তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় ছিলেন এবং খোমেনির পর দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দীর্ঘতম সময় দায়িত্ব পালন করেন।
তার উত্থান দেখায়, ইরানে ধর্মীয় নেতৃত্ব, বিপ্লবী বৈধতা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সাংবিধানিক পরিবর্তনের সমন্বয় কীভাবে একজন নেতাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার আসনে বসাতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইরানের অনন্য শাসনব্যবস্থার একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যেখানে নির্বাচিত সরকারের ওপরেও একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ধরে রাখে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, এএফপি