একটি জাতির উন্নতির মূল চাবিকাঠি তার মানবসম্পদ। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশ ইতিমধ্যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং সেসব দেশ দ্রুত সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভারত, সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলো। অথচ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির সহায়ক শক্তি হিসেবে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে কারিগরি শিক্ষার বিকাশ জরুরি হলেও তা অনেকটাই গুরুত্বহীন হয়ে আছে।
আজকের আধুনিক বিশ্বে যে জাতি প্রযুক্তিতে ও দক্ষতায় এগিয়ে, তারাই উন্নত। তাই বলা যায় কারিগরি শিক্ষা ছাড়া জাতি গঠন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ তরুণ । এই তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে আমাদের কারিগরিক শিক্ষাকে প্রাধান্ন্য দিতে হবে। বাংলাদেশ ক্রমাগত বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, একারনে বিদেশে দিনদিন দক্ষ শ্রমিকের চাহিদাও বাড়ছে।
বর্তমান বিশ্বের প্রায় ১৭৪টি দেশে এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিক কর্মরত। কিন্তু বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে এর অন্যতম কারণ হলো প্রবাসীদের কর্মদক্ষতার অভাব। অদক্ষ শ্রমিকের চেয়ে দক্ষ শ্রমিক প্রায় ১০ গুণ বেশি আয় করেন। এতে আমাদের সরকারেরও বেশ স্ব ইচ্ছার অভাবও পরিলক্ষিত করা যায়। সরকার দক্ষশ্রমিকের চেয়ে অদক্ষ শ্রমিক রপ্তারিতে বেশি খুশি।
তাই শ্রমিকের দক্ষতা নির্ভর করে শিক্ষার মানের ওপর। সাধারণ শিক্ষার দিক থেকে আমরা এগিয়ে থাকলেও দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারিনি। তাই গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন করা দরকার। অন্যথায় সনদধারী শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে যাবে এবং দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার অবনতি ঘটবে। তাই কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ক্রমবর্ধমান। এটি তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার সোপান খুলছে। দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো উদাহরণ প্রমাণ করে যে, কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিকে দ্রুত প্রতিযোগিতামূলক এবং স্থিতিশীল করে তোলে।
এই শিক্ষার মাধ্যমে তরুণরা কেবল কর্মমুখী দক্ষতা অর্জন করে না, বরং সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী মনোভাব এবং আত্মবিশ্বাসও অর্জন করে। লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে ২০৩০ সালে যখন আমাদের দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ হবে, সে সময় সর্বোচ্চ কর্মক্ষম জনসম্পদকে কাজে লাগিয়ে ২০৪০ সালে আমরা উন্নত বিশ্বের কাতারে পৌঁছাতে পারব।
দেশের শিল্প উন্নয়নের সঙ্গে সংগতি রেখে কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। নতুবা আমাদের বেকারত্ব ও আত্মনির্ভরতা বাড়ে। তাই যে জাতি কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়, সেই জাতিই শিল্পোন্নত ও স্বনির্ভর হয়। সেজন্য কারিগরি শিক্ষা কেবল পেশাগত প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং জাতি ও দেশ গঠনের অন্যতম স্তম্ভ হিসাবে বিবেচনা করা উচিত।