আফগানিস্তানের ভেতরে ‘গজব লিল–হক’ নামের সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ২২৮ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। আজ শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জানান, অভিযানে অন্তত ৩১৪ জন তালেবান যোদ্ধা আহত হয়েছেন এবং তালেবানের ৭৪টি সামরিক চৌকি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৮টি চৌকি পাকিস্তানি বাহিনী দখলে নিয়েছে বলে তাঁর দাবি। এর আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেখবাজ শরিফের বিদেশি গণমাধ্যমবিষয়ক মুখপাত্র মোশাররফ জাইদি দাবি করেছিলেন, পাল্টা হামলায় ১৩৩ জন তালেবান যোদ্ধা নিহত ও ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছে এবং একাধিক সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, চলমান সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৭ জন পাকিস্তানি নিরাপত্তা সদস্য আহত হয়েছেন, যদিও স্বাধীন সূত্রে এসব তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তালেবান সরকারের দেওয়া হিসাব পাকিস্তানের দাবি থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আফগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাকিস্তানের অভিযানে তাঁদের মাত্র ৮ জন যোদ্ধা নিহত ও ১১ জন আহত হয়েছে, আর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একাধিক সামরিক ফাঁড়ি তারা দখলে নিয়েছে বলে তালেবানের দাবি। দুই পক্ষের বিবৃতির মধ্যে বড় ধরনের অমিল থাকায় সীমান্ত এলাকায় ঠিক কতজন হতাহত হয়েছেন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, সংঘাতের প্রেক্ষাপটে উভয় পক্ষই নিজেদের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ‘তথ্যযুদ্ধ’ চালাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে পাল্টা অভিযোগ তুলেছে আফগানিস্তানের তালেবান সরকার। আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, সংঘর্ষ শুরুর আগে পাকিস্তান ‘বারবার’ যুদ্ধবিরতির অনুরোধ জানালেও পরে আবার হামলা চালাতে থাকে। তাঁর ভাষ্য, আফগানিস্তান মূলত সংলাপের মাধ্যমে বর্তমান সংকটের সমাধান চায়, কিন্তু প্রযোজ্য হলে পাকিস্তানের ওপর আরও কঠোর সামরিক জবাব দেওয়ার সামর্থ্য কাবুলের আছে। তিনি বলেন, আফগান বাহিনী পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়ে দেখিয়েছে, ‘আমাদের হাত তাদের গলা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।’
জাবিউল্লাহ মুজাহিদ তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) ইস্যুকে ‘অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা তৈরির পূর্বপরিকল্পিত অজুহাত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, টিটিপি মূলত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা, এ নিয়ে আফগানিস্তানকে দায়ী করা ঠিক নয়। তিনি আরও দাবি করেন, ভারতের সঙ্গে আফগানিস্তানের ভালো সম্পর্ক থাকলেও সেটি কখনোই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। আফগান সরকারের অবস্থান, সীমান্ত উত্তেজনা প্রশমনে পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগই দীর্ঘমেয়াদে একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ।
এদিকে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেছেন, আফগানিস্তানের ভেতর থেকে পরিচালিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর কথিত হামলার জবাবে পাকিস্তান প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং দেশের সীমান্ত ও আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তাঁর দাবি, সাম্প্রতিক সংঘর্ষে আফগান তালেবান সরাসরি পাকিস্তানি লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা চালিয়েছে এবং ড্রোন ব্যবহারসহ নতুন কৌশল নিয়েছে।
পাকিস্তানের তিন শহরে ড্রোন হামলার চেষ্টা ব্যর্থ
তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানান, পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের অ্যাবোটাবাদ, সোয়াবি ও নওশেরা শহরে ছোট আকারের ড্রোনের মাধ্যমে হামলার চেষ্টা করা হয়, যা পাকিস্তান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নস্যাৎ করে দেয়। তাঁর বরাতে গণমাধ্যম জানিয়েছে, সব ড্রোনই আকাশেই ভূপাতিত করা সম্ভব হয়েছে এবং এ ঘটনায় কোনো প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘ফিতনা আল–খওয়ারিজ’ নামে পরিচিত জঙ্গিগোষ্ঠী এসব ড্রোন হামলার চেষ্টা চালিয়েছিল এবং ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করেছে, আফগান তালেবান শাসনব্যবস্থা ও পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের মধ্যে সরাসরি যোগসাজশ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আফগানিস্তান–পাকিস্তান সীমান্তঘেঁষা এ সংঘাত ইতিমধ্যে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যস্থতার প্রয়োজন হতে পারে। জাতিসংঘসহ একাধিক সংস্থা সীমান্ত এলাকায় বেসামরিক লোকজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামরিক উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছে