বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে স্পর্শকাতর প্রকল্পগুলোর একটি হলো রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত এই প্রকল্প দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। তবে সম্প্রতি জনবল নিয়োগে অনিয়ম, দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগে প্রকল্পটি তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন।
হাইকোর্টের নির্দেশনা
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জনস্বার্থে দায়ের করা এক রিটের শুনানি শেষে আদেশ দেন। নির্দেশনায় বলা হয়—
- তদন্ত কমিটি গঠন: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করতে হবে।
- সময়সীমা: দুই মাসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
- তদন্তের পরিধি: নিয়োগে ঘুষ, জাল সনদ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবসহ সব অনিয়ম খতিয়ে দেখতে হবে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু: এনপিসিবিএল
রূপপুর প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্বে থাকা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একটি পারমাণবিক স্থাপনায় যেখানে দক্ষতা ও সততাই হওয়া উচিত প্রধান মানদণ্ড, সেখানে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক প্রভাব প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাল সনদে নিয়োগ
অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু প্রার্থী ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ও অভিজ্ঞতার কাগজপত্র ব্যবহার করে স্থায়ী পদে নিয়োগ পেয়েছেন। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় অদক্ষ জনবল নিয়োগ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক ও বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিদায়ী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মহলের আশীর্বাদে অযোগ্যদের বড় পদে বসানো হয়েছে। মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অর্থ লেনদেনের ভিত্তিতে পদায়ন করা হয়েছে—এমন অভিযোগ এখন ব্যাপক আলোচনার বিষয়।
জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি
পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর প্রটোকল।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন—অদক্ষ জনবল থাকলে ভবিষ্যতে চেরনোবিল পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর মতো দুর্ঘটনার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এছাড়া, এই প্রকল্পে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানকারী রোসাটম-সহ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।
তদন্তের চ্যালেঞ্জ
তদন্ত কমিটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো—
- নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা
- গায়েব বা পরিবর্তিত নথি উদ্ধার
- শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে সনদ যাচাই
শুদ্ধি অভিযানের প্রত্যাশা
রূপপুর প্রকল্প কেবল একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়; এটি বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রতীক। হাইকোর্টের এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে।
জনগণের প্রত্যাশা—স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং প্রকল্পটি দুর্নীতিমুক্ত করে দক্ষ জনবল দ্বারা পরিচালিত হবে।
আগামী দুই মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে এই বিতর্কের অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।