ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট। ফলে প্রস্তাবিত রাষ্ট্র সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ উন্মুক্ত হলো। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গণভোটে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং ‘না’ ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বেসরকারিভাবে এ ফলাফল ঘোষণা করেন। তিনি জানান, মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১২ কোটির বেশি।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে। প্রস্তাব অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার কিছু অংশ সীমিত করা এবং রাষ্ট্রপতির নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল এবং কিছু ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির ভূমিকা থাকবে।
বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাহী ক্ষমতার বেশিরভাগ প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে সংসদ সদস্যদের ভোট প্রদানে স্বাধীনতা বাড়বে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া জাতীয় সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করার প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে উচ্চকক্ষ আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রেও কঠোর শর্ত আরোপের কথা বলা হয়েছে, যাতে একক কোনো দলের উদ্যোগে সহজে সংশোধন সম্ভব না হয়।
সংবিধানসংক্রান্ত মোট ৪৮টি প্রস্তাব গণভোটে তোলা হয়, যার মধ্যে ১৯টি মৌলিক সংস্কার হিসেবে চিহ্নিত ছিল। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য আগে একটি আদেশ জারি করা হয়। গণভোট ছিল সেই প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপ। এখন তৃতীয় ধাপে আগামী নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা হবে। প্রথম অধিবেশন শুরুর পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিষদকে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে।
সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে—এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন এবং প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে দলীয় প্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন না। রাষ্ট্রপতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিজ ক্ষমতায় নিয়োগ দিতে পারবেন বলেও প্রস্তাবে উল্লেখ আছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগসহ একাধিক খাতে গঠিত কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’র স্পষ্ট জয় রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াকে এখন নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।