আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নজিরবিহীন এক অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়েছে। দলীয় হাইকমান্ডের কঠোর হুঁশিয়ারি, বহিষ্কার ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা সত্ত্বেও অন্তত ৭৯টি আসনে ৯২ জন স্বতন্ত্র বা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী দলীয় প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
বিশেষ করে ৪৬টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা এতটাই শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন যে সেখানে বিএনপির প্রতীক ‘ধানের শীষ’ এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের জয় এখন অনিশ্চিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
ভোট ভাগের আশঙ্কা, লাভবান হতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বীরা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই কোন্দলের সরাসরি সুবিধাভোগী হতে পারে জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। অনেক আসনে ত্রিমুখী লড়াই তৈরি হওয়ায় ধানের শীষের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বিএনপি এবার ২৯১টি আসনে সরাসরি দলীয় প্রার্থী দিলেও যুগপৎ আন্দোলনের মিত্রদের জন্য ৮টি আসন ছেড়ে দিয়েছে। তবে বিদ্রোহের আগুন সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে সেই সব এলাকায়, যেখানে স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন।
বাগেরহাট থেকে ঢাকা—বিদ্রোহের বিস্তার
বাগেরহাটের চারটি আসনেই বিএনপির দলীয় প্রার্থীদের বিপরীতে শক্ত বিদ্রোহী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এম এ এইচ সেলিম বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। তার দাবি, দলীয় মনোনীত প্রার্থীরা এলাকায় পরিচিত নন। দলীয় প্রার্থীরাও স্বীকার করছেন, এই বিভাজন ভোটের অঙ্কে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
ঢাকা-১৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সানজিদা ইসলাম তুলির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন বহিষ্কৃত নেতা এস এ সিদ্দিক সাজু, যিনি সাবেক সংসদ সদস্য এস এ খালেকের সন্তান এবং শক্তিশালী পারিবারিক ভোটব্যাংকের অধিকারী। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান যুক্ত হওয়ায় ত্রিমুখী লড়াই স্পষ্ট।
একইভাবে ঢাকা-১২ আসনে জোট প্রার্থী সাইফুল হকের বিপক্ষে শক্ত অবস্থানে আছেন প্রভাবশালী নেতা সাইফুল আলম নীরব।
সংঘর্ষ, বিভক্ত তৃণমূল
কুমিল্লা-২ আসনে বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস-২ আব্দুল মতিন খান স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি প্রার্থী সেলিম ভূঁইয়ার সমর্থকদের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে রুমিন ফারহানা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ধানের শীষের সমর্থকরা স্পষ্টভাবে দুই ভাগে বিভক্ত।
মিত্র আসনেও বিদ্রোহ
বিএনপি যেসব ৮টি আসন মিত্রদের ছেড়ে দিয়েছে, তার মধ্যে ৪টিতেই বিদ্রোহীরা সক্রিয়।
- পটুয়াখালী-৩: জোটের প্রার্থী গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর। তার বিপক্ষে মাঠে আছেন ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান মামুন। বিদ্রোহ দমাতে একাধিক উপজেলা কমিটি বিলুপ্ত করেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
- নারায়ণগঞ্জ-৪: জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসেন কাসেমীর বিপক্ষে শক্ত অবস্থানে আছেন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা মোহাম্মদ শাহ আলম ও গিয়াস উদ্দিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বলেন, “৭৯টি আসনে ৯২ জন বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার বড় প্রমাণ। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় মনোনয়ন নিয়ে নেতাদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়াই এই ক্ষোভের মূল কারণ।”
অন্যদিকে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন দাবি করেন, “আন্দোলনে ভূমিকা রাখা অনেক নেতা অভিমান থেকে প্রার্থী হয়েছেন। সাংগঠনিক ব্যবস্থা ও ভোটারদের সচেতনতার মাধ্যমে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত করা সম্ভব।”
সামনে বড় বিপর্যয়ের শঙ্কা
সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত সরে না দাঁড়ালে ৩০ থেকে ৩৫টি আসনে বিএনপির নিশ্চিত জয় হাতছাড়া হতে পারে। বিশেষ করে যেসব আসনে জামায়াতে ইসলামী শক্ত প্রার্থী দিয়েছে, সেখানে বিএনপির ভোট ভাগ হলে ফলাফল পাল্টে যেতে পারে।
এদিকে বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করার অভিযোগে অনেক এলাকায় স্থানীয় কমিটি ভেঙে দেওয়ায় তৃণমূলের চেইন-অব-কমান্ড কার্যত ভেঙে পড়ছে।
বিএনপি হাইকমান্ড আশা করছে, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসবে, ‘ব্র্যান্ড ধানের শীষ’ বিদ্রোহীদের ছাপিয়ে যাবে। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনেক আসনে বিদ্রোহীদের প্রচার ও অর্থবল দলীয় প্রার্থীদের চেয়েও বেশি।
১২ ফেব্রুয়ারির আগে যদি এই ৪৬ আসনের সংকট সামাল দেওয়া না যায়, তাহলে ধানের শীষ শিবিরে বড় ধরনের রাজনৈতিক ধাক্কা আসতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।