বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সম্প্রতি জানিয়েছে, অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে আবারও জাতীয় দলে বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। প্রায় দেড় বছর জাতীয় দলের বাইরে থাকার পর হঠাৎ এই অবস্থান পরিবর্তন ক্রিকেট অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—এটি কি কেবল ক্রিকেটীয় সিদ্ধান্ত, নাকি চলমান সংকট থেকে দৃষ্টি সরানোর কৌশল?
২০২৪ সালের অক্টোবরে ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্টের পর আর জাতীয় দলের জার্সিতে দেখা যায়নি সাকিবকে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তার অনুপস্থিতির বড় কারণ। সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টার মন্তব্যেও সে ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট। ২০২৪ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া এবং পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় বিদেশে অবস্থান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট ঘিরেও সমালোচনা তৈরি হয়। পরবর্তীতে তার নাম বিভিন্ন মামলায় জড়ায়, যদিও আগের সরকার আমলেও তিনি জাতীয় দলে খেলেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মিরপুর টেস্ট খেলে অবসর নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও রাজনৈতিক বিতর্ক ও নিরাপত্তা শঙ্কায় দেশে ফেরা হয়নি তার। সরকারের অনুমতি না পাওয়ায় মাঝপথ থেকে বিদেশে ফিরে যেতে হয়। সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টার সঙ্গে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি মন্তব্যও আলোচনায় আসে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিসিবির দীর্ঘ বৈঠকের পর জানানো হয়, সাকিবের ফিটনেস, প্রাপ্যতা ও সংশ্লিষ্ট ভেন্যুতে খেলতে পারার সক্ষমতা থাকলে তাকে দলে নেওয়া হতে পারে। বোর্ডের একাধিক পরিচালক জানান, সাকিব নিজেও জাতীয় দলে ফেরার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং হোম-অ্যাওয়ে সিরিজে খেলার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। এমনকি তাকে কেন্দ্রীয় চুক্তির প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
তবে এই ঘোষণা এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বিসিবি নানা ইস্যুতে চাপে রয়েছে। আইসিসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে না; ভেন্যু পরিবর্তনের প্রস্তাব সমর্থন পায়নি। বোর্ড সভা চলাকালেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, বাংলাদেশের পরিবর্তে অন্য দল বিশ্বকাপে খেলবে। একই সময়ে বোর্ডের একাধিক পরিচালকের পদত্যাগ ও অভ্যন্তরীণ বিরোধের খবর প্রকাশ্যে আসে। বিপিএলে অনিয়মের অভিযোগ, পরিচালকদের বিরুদ্ধে সমালোচনা, ক্রিকেটারদের অসন্তোষ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অস্বস্তিকর।
মাঠের বাইরেও সাকিবকে ঘিরে পরিস্থিতি ছিল তীব্র। তার জার্সি বা নাম লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে মাঠে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কয়েক মাস আগেও বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা তার দলে ফেরার সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। এখন হঠাৎ করে অবস্থান বদল অনেকের কাছেই রহস্যজনক।
বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক বিষয় সরকারের আওতাধীন; বিসিবি কেবল ক্রিকেটীয় দিক বিবেচনা করবে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও বিতর্কের মধ্যে দেশের সবচেয়ে পরিচিত ক্রিকেটারকে সামনে আনা জনমত ঘোরানোর কৌশলও হতে পারে।
আগামী মার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের পরবর্তী আন্তর্জাতিক সিরিজ। ততদিনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বোর্ডের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসবে কি না, সেটিও অনিশ্চিত। এই বাস্তবতায় সাকিবের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন শুধু মাঠের পারফরম্যান্সের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজনীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বোর্ডের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা।
শেষ পর্যন্ত সাকিব জাতীয় দলে ফিরবেন কি না, তা নির্ভর করছে বহুমাত্রিক বাস্তবতার ওপর। তবে একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই ইস্যু সামনে এনে বিসিবির চলমান সংকট কতটা প্রশমিত হবে?