বিশ্ব সভ্যতার নির্মাণ কাজ নারী-পুরুষের চার হাত আর কারিগরি প্রযুক্তির বিবর্তনের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে। যারা বিশ্বাস করেন না, তারা এই ছবির নারীদের ভূমিকা দেখে একটু অতীত ভেবে দেখতে পারেন। দৃষ্টিভঙ্গিতে কুরুচিপূর্ণতা আর কুসংস্কার চাপিয়ে নিজেদের স্বার্থে নারীকে পুরুষ ঠেলে অন্দরে প্রবেশ করাতে সমর্থ হয়েছে। নারী শক্তি অন্দরে ব্যবহৃত পদার্থ আর পুরুষ তার ভোগের বস্তুতে পরিণত করেছে।
এখানে নারীর বড় একাংশ তার শক্তিতে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও সেই শক্তি কাজে না লাগিয়ে নিজেরা অন্যরকম অলসতার ভোগে শৃঙ্খলে আটকে পড়েছে।
তাই তো বলা হয় – নারী পারে না, পারবে না বা অযোগ্য, অবলা, কমজোরি এবং সন্তান উৎপাদনের একটা যন্ত্র বিশেষ। কত কৌশল! কত শঠতা! কত ধর্মের অপব্যবহার! কত অপরাজনীতি দিয়ে নারীকে ছোট করা হচ্ছে, আবদ্ধ করা হচ্ছে।
নারী যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাথায় পাথরের টুকরোর টুপরী বহন করতে পারে, পরিশ্রম করতে পারে তবে কেন তাকে ঘরে পাঠাবেন? কেন তাকে তার শক্তি এবং শ্রমের মর্যাদা দেবেন না? নির্মাণকাজ চলছে এমন প্রতিটি স্থানেই এক শ্রেণির নারীরা যোগ্যতার সাথে এমন পরিশ্রমের কাজ করছে। দেখছেনও সবাই, কিন্তু চাইলে আর অভ্যস্ত হলে সব নারীরাই যে এমনভাবে নিজের শক্তি কাজে লাগাতে পারে—সে ব্যাপারে কি কারও কোনো সন্দেহ আছে?
হা কিছুটা আছে! কারণ আমরা যে সব নারীদের এই সব নারীদের সাথে তুলনা করব মানে নিজেদের স্বজন নারী তাদেরকে আমরা অবৈজ্ঞানিক নিয়ম দিয়ে চলতে-ফিরতে পঙ্গু করে রেখেছি। পাঁচ কদমও হাঁটতে পারে না এবং পাঁচ হাত সাঁতার পর্যন্ত জানে না। মানুষ সে হোক নারী অথবা পুরুষ চাইলেই সে স্বাভাবিক কাজ নিজেদের শক্তি এবং মেধা প্রয়োগ করে করতে পারে। দরকার করানো এবং করা।
সৌদি নারীরা সুপার শপের কাজে ফিরে আসতে পারবেন এটাও ছিল এক সময়ে স্বপ্ন। সৌদি বিমানবন্দরে অচল মানুষ এবং মালামাল বহন করা ট্রান্সপোর্টগুলোর অর্ধেকের চালক এখন নারী, পুলিশ নারী।, বিমান যাত্রীদের বোর্ডিং নিয়ন্ত্রণে অর্ধেক নারী। ক’দিন পূর্বেও এমন দৃশ্য তারা চাইছে বলেই সম্ভব হয়েছে।
আর আমরা নিজেদের পেছনে তাকাই না। শতভাগ চাকরিরত নারীদের পুরুষালী ভর্তুকি দিয়ে, রাষ্ট্রের অর্থ প্রণোদনা দিয়ে তাদের নিজেদের ঘরের অন্দরে পাঠাতে চাই। সন্তান তৈরির মেশিন বানাতেই চাই, বিয়ের নামে একাধিক নারীকে ভোগ করতে চাই। যদিও কর্মক্ষম, জ্ঞানী, বুদ্ধিমতি নারীর চোখে চোখ রাখবার ক্ষমতাও এমন সব পুরুষের থাকে না। আবার এমন সব অপযুক্তির পক্ষেই আছেন নারীদের এক বড় অংশ! তারাই বরং আজ অপশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেষ করব একটু প্রশ্ন দিয়ে, জ্বর হলে নারী আর পুরুষ কি আলাদা আলাদা ট্যাবলেট বা ওষুধ পান করে, নাকি একই প্যারাসিটামল? মানুষের রোগমুক্তি আর নারীমুক্তির ওষুধটা একই, ওরা পারছেন মানে সবাই পারবেন।
উন্নত দেশে এসব পেশায়—বিশেষ করে রঙ আর প্লাস্টারের কাজে তো নারীরাই এখন বেশি। গাড়ি চালনায় বড় একাংশই নারী। প্রযুক্তির কল্যাণে ক’দিন পরে যদিও গাড়িও চলবে ড্রাইভিংবিহীন।
শেষ কথাঃ যারা ভোট পেতে বেহেশতের টিকিট বিক্রি করছেন, তারা কি এই সব শ্রমজীবী নারীর মাথার টুপরীটা নিজেদের মাথায় নেবেন? বা কখনো নিয়েছেন? যিনি ইট, বালু, পাথর, সিমেন্টের হিসাব রাখছেন, তার শক্তি ঐ নারীর চেয়ে কম? তিনি বা অন্যরা কি ভদ্রতা বা মানবিকতা দেখিয়ে কখনো বলেছেন, “বোন! তোমার কষ্ট হচ্ছে! দাও তোমার মাথার পাথরভরা টুপরীটা আমি টানি”?
যারা এখন ভোট চাইছেন ঐ নারীর মতো মানুষের কাছে, তারা কি একবারও এমন মানবিক মানুষ হবার উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন? নাকি অভাবী স্ট্যাটাসটাকে এখন নবাবী এবং স্বাভাবিক করতে নেওয়া সকল কৌশল অবলম্বন করে সার্থক হয়েছেন? ক্ষমতায় যেতে নারীবিদ্বেষীদের সাথে ভোটের জোট করেছেন। বেহেশতের টিকিট বিক্রির সঙ্গী হয়েছেন।
দুই বেলা অপুষ্টিকর খাবার আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভারী শ্রমেও নারী কিন্তু দমে না। শুধু মনে করবার চেষ্টা করুন আপনার রোগ সারতে অ্যান্টিবডি নিতে হয়, ওদের অ্যান্টিবডি ওদের শরীরেই তৈরি হয়। এই নিয়ম নারী পুরুষ সবার জন্যই সমান প্রযোজ্য।
সুতরাং পাঠক আপনার কাছে প্রস্ন চোখ খুলে দেখুন তো—
নারীর মুক্তি কোথায়?
নারীকে স্বাবলম্বী করা?
নাকি অন্দরে ঠেলে দেওয়া? –