বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল আরেকটি নির্বাচনের তারিখ নয়—এটি একটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয় পুনর্নির্ধারণের দিন। টানা দেড় দশকের একক শাসন, ২০২৪ সালের রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং রাজনৈতিক কাঠামোর ভাঙনের পর এই প্রথম জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
১৭ কোটির বেশি মানুষের এই ভোট শুধু ক্ষমতা বদলের নয়, বরং প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশ কি এবার সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রে ফিরতে পারবে?
অন্তর্বর্তী সরকার ও ভাঙা রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি এবং নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য নির্ধারিত হয়—একটি গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন।
ড. ইউনূস দায়িত্ব গ্রহণের সময় যে রাষ্ট্রযন্ত্র পেয়েছিলেন, তা কার্যত অচল ছিল। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবখানেই ছিল আস্থার ঘাটতি। দেড় বছরের সংস্কার ও পুনর্গঠনের পর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হওয়া অনেকের কাছে স্বস্তির নিঃশ্বাস।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নির্বাচনকে ইতোমধ্যে “২০২৬ সালের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক অনুশীলন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
রাজনীতির নতুন মেরুকরণ
এবারের নির্বাচনে রাজনীতির চিরচেনা মানচিত্র বদলে গেছে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে। সিলেট থেকে শুরু করা তার প্রচারণা স্পষ্ট করেছে—তৃণমূলে জিয়া পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখনো জীবিত। দলের ভেতরে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য, বাইরে নতুন প্রত্যাশা।
একই সঙ্গে দৃশ্যপটে উঠে এসেছে জামায়াত-ই-ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট। অতীতের বিতর্কিত পরিচয়ের বাইরে এসে তারা “সেবামুখী রাজনীতি” ও “দুর্নীতিমুক্ত সমাজ”-এর বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি অংশ, যারা পুরোনো দুই ধারার বাইরে বিকল্প খুঁজছে, তাদের কাছে এই জোট নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন স্থগিতাদেশের কারণে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে কার্যত অনুপস্থিত। দলটির প্রধান নেত্রীর সাজা ও রাজনৈতিক শূন্যতা দেশের রাজনীতিতে এক অস্বাভাবিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।
নির্বাচনই নয়, সংবিধান সংস্কারের রায়
১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল সংসদ গঠনের নয়—এটি একটি গণভোটের দিনও।
‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নামের সংস্কার প্রস্তাবের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা, মেয়াদ নির্ধারণ, অর্থপাচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর কাঠামো—এসব প্রস্তাব ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্র ঠেকানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।
২৫টি রাজনৈতিক দল এই সনদে একমত হলেও চূড়ান্ত বৈধতা আসবে জনগণের রায়ের মাধ্যমে।
তরুণ ভোটার: নির্ধারক শক্তি
বাংলাদেশের ভোটারদের বড় অংশ তরুণ—যাদের অনেকেই ২০২৪ সালের আন্দোলনের সরাসরি অংশগ্রহণকারী। এই ‘জেন-জি’ ভোটাররা দলীয় স্লোগানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় জবাবদিহিতা, কর্মসংস্থান, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতায়।
তাদের ভোট কোন দিকে যায়—সেটাই নির্ধারণ করবে ক্ষমতার পালাবদল।
আন্তর্জাতিক নজর ও তথ্যযুদ্ধ
নির্বাচনের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাতিসংঘ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর নজর রাখছে।
অন্তর্বর্তী সরকার সতর্ক করেছে—সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া তথ্য, বিদেশি প্রোপাগান্ডা ও সাম্প্রদায়িক উসকানি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি রাজনৈতিক অধ্যায় নয়—এটি একটি ব্যবস্থাগত রূপান্তরের সন্ধিক্ষণ।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, জামায়াতের নতুন রাজনৈতিক অবস্থান এবং ড. ইউনূসের সংস্কারবাদী রোডম্যাপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের মোড়ে।
রক্ত দিয়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশে শেষ পর্যন্ত জনগণ কাদের হাতে রাষ্ট্রের চাবি তুলে দেয়—সেই রায়ের অপেক্ষায় শুধু দেশ নয়, তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।