ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর এক মাসও বাকি নেই। এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা আট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) হঠাৎ বদলি করেছে সরকার। মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
প্রজ্ঞাপনে বদলির কোনো কারণ উল্লেখ না করায় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের মুখে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল কর্মস্থল পরিবর্তন করলে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী,
- বরগুনার পাথরঘাটার ইউএনও ইশরাত জাহান → ভোলার চরফ্যাশন
- চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের ইউএনও আল আমীন → ফরিদপুরের নগরকান্দা
- পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার ইউএনও রেহেনা আক্তার → বগুড়ার ধুনট
- হবিগঞ্জের বাহুবলের ইউএনও লিটন চন্দ্র দে → চুয়াডাঙ্গার জীবননগর
- বগুড়ার ধুনটের ইউএনও প্রীতিলতা বর্মন → হবিগঞ্জের বাহুবল
- ফরিদপুরের নগরকান্দার ইউএনও মেহরাজ শারবীন → নেত্রকোণার কলমাকান্দা
- নেত্রকোণার কলমাকান্দার ইউএনও মাসুদুর রহমান → পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া
- ভোলার চরফ্যাশনের ইউএনও লোকমান হোসেন → বরগুনার পাথরঘাটা
বদলির তালিকায় থাকা কয়েকজন ইউএনও সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক ও অভিযোগের মুখে ছিলেন।
নেত্রকোনার কলমাকান্দায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় ইউএনও মাসুদুর রহমানের সঙ্গে এক ইউপি চেয়ারম্যানের প্রকাশ্য বাগ্বিতণ্ডা হয়। ওই চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করার মাত্র দুই দিনের মাথায় ইউএনওকে বদলি করা হয়, যা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, গত ৩০ ডিসেম্বর বরগুনার পাথরঘাটার ইউএনও ইশরাত জাহানের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তাকে অপসারণের দাবি জানিয়েছিল বিএনপি।
এছাড়া পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার ইউএনও রেহেনা আক্তারের বিরুদ্ধে গণভোটে ‘না’ ভোটে উৎসাহিত করার লিখিত অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জমা পড়েছিল বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “অভিযোগ থাকার পরও কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার না করে কেবল স্টেশন পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে কার্যত দায় এড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়, যা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।”
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আব্দুস সবুর মনে করেন, “এটি একটি প্রশাসনিকভাবে দুর্বল সিদ্ধান্ত। অভিযোগের মীমাংসা না করে বদলি করলে জনগণের আস্থা ফেরানো যায় না, বরং সন্দেহ আরও গভীর হয়।”
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্মসচিব জানান, নির্বাচনের সময় নতুন করে মাঠে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া জটিল। তাই অভিযোগ থাকলেও তাঁদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, এটি একটি চলমান প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুরোধেই এই বদলির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনের ঠিক আগে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের এভাবে বদলি—তাও কারণ উল্লেখ ছাড়া—নির্বাচনী প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগের নিষ্পত্তি ছাড়া শুধু বদলি কি আদৌ স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে।