মাগুরার শালিখা উপজেলায় বিবাহ বিচ্ছেদের হার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই উপজেলাতেই ঘটেছে ৫৮১টি তালাকের ঘটনা, যা সামাজিক কাঠামোর জন্য গভীর সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শালিখা উপজেলার মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সাতটি ইউনিয়নে মোট ৫৮১টি বিবাহ বিচ্ছেদ নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে উপজেলাটিতে ১ হাজার ৪২টি বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী,
- তালখড়ি ইউনিয়ন: ১৪৪টি
- শতখালী ইউনিয়ন: ১২২টি
- আড়পাড়া ইউনিয়ন: ১০৪টি
- শালিখা ইউনিয়ন: ৭৯টি
- বুনাগাতী ইউনিয়ন: ৬৪টি
- ধনেশ্বরগাতী ইউনিয়ন: ৪৪টি
- গঙ্গারামপুর ইউনিয়ন: ২৪টি
সবচেয়ে বেশি তালাক হয়েছে তালখড়ি ইউনিয়নে, আর সবচেয়ে কম গঙ্গারামপুর ইউনিয়নে।
এর আগের বছর ২০২৪ সালেও শালিখা উপজেলায় তালাকের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। ওই বছর সাত ইউনিয়নে ৫১১টি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে, বিপরীতে নিকাহ সম্পন্ন হয়েছিল ৮৫২টি। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৮টি বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে।
২০২৫ সালের তালাকের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়,
- পুরুষ পক্ষ থেকে তালাক: ৩৮টি
- উভয় পক্ষের সম্মতিতে (মিউচুয়াল): ১৯৩টি
- নারী পক্ষ থেকে ‘ডি তালাক’: ৩৪৮টি
নারী পক্ষ থেকে দেওয়া তালাকের সংখ্যা পুরুষ পক্ষের তুলনায় প্রায় নয় গুণ বেশি। তালাকপ্রাপ্ত নারীদের বয়স সাধারণত ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে।
শালিখা উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রার রোকনুজ্জামান বলেন, “অধিকাংশ বিবাহ বিচ্ছেদের পেছনে পরকীয়া সম্পর্ক প্রধান কারণ। পাশাপাশি পারিবারিক বনিবনার অভাব, স্বামীর দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকা ও সামাজিক অবক্ষয়ও বড় ভূমিকা রাখছে।”
শালিখা উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আব্দুল আওয়াল (অতি. দা.) বলেন, “বিবাহ বিচ্ছেদ রোধে আমরা মাঝে মাঝে উঠান বৈঠকের আয়োজন করি। তবে বিষয়গুলো মূলত ইউনিয়ন পরিষদের আওতাভুক্ত।”
এ বিষয়ে শালিখা উপজেলা কোর্ট মসজিদের খতিব মুফতি মোশারফ হোসেন কাসেমী বলেন, “ইসলামি জ্ঞান ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, পরকীয়া, পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির কারণে তালাক বাড়ছে। এতে সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি মানুষের মানসিক চাপও বেড়ে যাচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, বিবাহ বিচ্ছেদের এই ঊর্ধ্বগতি শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করে দিতে পারে।
তারা মনে করছেন, পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ জোরদার এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।