মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অন্তত ৪৫ জন। এর মধ্যে ২০২৫ সালে নিহত হয়েছেন ৩২ জন এবং ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পরবর্তী প্রায় চার মাসে নিহত হন আরও ১২ জন।
সর্বশেষ সোমবার দিবাগত রাতে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে সেনা হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সামসুজ্জামান ডাবলু (৫২)। তার মৃত্যুর পর হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তার ভাষায়, এসব ঘটনার পর সরকার কী ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। ফলে একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। একই সঙ্গে কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে, যা অস্বাভাবিক।
এর আগে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর কুমিল্লায় যৌথবাহিনীর হেফাজতে যুবদল নেতা তৌহিদুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনা হয়। ওই সময় সংশ্লিষ্ট সেনা কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার ও তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হলেও নিহতের পরিবার জানায়, এখনো কোনো কার্যকর অগ্রগতি তারা দেখতে পাননি। মামলার তদন্ত চলছে বলা হলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই বলে অভিযোগ করেন তৌহিদুলের ভাই আবুল কালাম।
একই ধরনের অভিযোগ উঠে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলায় যৌথবাহিনীর অভিযানে নিহত ফিরোজা বেগমের ঘটনায়। তার পরিবারের দাবি, কোনো মামলা না থাকা সত্ত্বেও তাকে আটক করে নির্যাতন করা হয়। তবে পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যুর কথা উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে বিএনপি নেতা সামসুজ্জামান ডাবলুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। পরিবারের দাবি, তাকে ফার্মেসি থেকে তুলে নিয়ে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতারাও একই অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের অভিযানে তাকে আটক করা হয় এবং অভিযানের পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আইএসপিআর বলেছে, ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক এবং ইতোমধ্যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তবে নিহতের পরিবারের অভিযোগ, অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি সাজানো নাটক এবং ঘটনার পরপরই পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে নিতে এ দাবি তোলা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আসক এক বিবৃতিতে বলেছে, রাষ্ট্রীয় হেফাজতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু সংবিধান, আইনের শাসন এবং মানবাধিকারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার ওপর সরাসরি আঘাত। তারা নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের পাশাপাশি দায়ীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
এ ঘটনায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার দাবি করেন।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনায় থানায় নতুন করে মামলা বা তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।